ফিরে দেখা ‘২৪-এর জুলাই বিপ্লব: ৩ জুলাই কী ঘটেছিল?

বিশেষ প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

সময়টা ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। তখনো কেউ জানত না, এই চেনা ঢাকা, এই চিরচেনা পিচঢালা রাজপথ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এক স্বৈরাচারী শাসনের পতনের মহাকাব্য লিখবে। তখনো চারপাশটা রক্তে রঞ্জিত হয়নি, বাতাসে ওড়েনি বারুদের গন্ধ। কিন্তু তরুণ চোখের ভেতরে জমছিল এক চাপা ক্ষোভ আর অধিকার আদায়ের তীব্র জেদ। সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতির নামে ৫৬ শতাংশের বৈষম্যের যে প্রাচীর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ খাড়া করেছিল, তার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ তখন রাজপথে নামতে শুরু করেছে মাত্র।

আজ ৩ জুলাই ২০২৬। ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্তির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আজ আমাদের ফিরে তাকাতেই হয় সেই দিনটির দিকে, যা ছিল এই দীর্ঘ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম এক শুরুর দিন।

শাহবাগে দেড় ঘণ্টার স্তব্ধতা

৩ জুলাই ২০২৪, বুধবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার চত্বরে সকাল থেকেই জড়ো হতে শুরু করেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ব্যানারটা তখনো একদম নতুন—‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। লাইব্রেরির সামনে থেকে শুরু হওয়া একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল মুহূর্তেই রূপ নেয় জনসমুদ্রে। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে নীলক্ষেত, ঢাবি ক্যাম্পাস আর রাজু ভাস্কর্য। মিছিলটি যখন দুপুরের দিকে ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ত মোড় ‘শাহবাগ’ অভিমুখে যাত্রা করে, তখন চারপাশের ট্রাফিক থমকে যায়।

বিকেল গড়ার আগেই শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় পুরোপুরি অবরোধ করে বসে পড়েন। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা রাজধানী ঢাকার হৃৎপিণ্ড বলে পরিচিত এই মোড়টি ছিল অবরুদ্ধ। কিন্তু এই অবরোধ কেবল গাড়ির চাকা থামানোর অবরোধ ছিল না, এটি ছিল বিগত ১৬ বছর ধরে ডালপালা মেলা এক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বুকে প্রথম জোরালো ধাক্কা।

💡 ইনসাইড অ্যানালিসিস: ৩ জুলাইয়ের দেড় ঘণ্টার এই প্রতীকী অবরোধই পরবর্তীতে সরকারকে কাঁপিয়ে দেওয়া ‘বাংলা ব্লকেড’ এবং ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর মতো মেগা কর্মসূচির আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ

কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, ৩ জুলাইয়ের সেই স্ফুলিঙ্গ একই দিনে ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও সেদিন শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়ে রাজপথে অবস্থান নেন। রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি বা নির্বাহী আদেশের দাবিতে অনড় তরুণরা সেদিন জানান দিয়েছিলেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কীভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়।

এক নজরে ৩ জুলাই ২০২৪-এর ক্রাইসিস ম্যাপ

আন্দোলনের কেন্দ্র (Hotspots) অ্যাকশন ও কর্মসূচি (Action Log) প্রভাব ও ফলাফল (Impact)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে মিছিল ও রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
শাহবাগ মোড় দুপুর থেকে টানা দেড় ঘণ্টা সম্পূর্ণ অবরোধ রাজধানীর মূল ট্রাফিক ব্যবস্থা স্থবির।
ঢাকার বাইরে (জাবি, রাবি, চবি) মহাসড়ক অবরোধের প্রচ্ছন্ন বার্তা ও বিক্ষোভ মিছিল। আন্দোলনকে ক্যাম্পাস থেকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথম ধাপ।

আজ ২০২৬ সালের এই স্বাধীন ও মুক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে ৩ জুলাইয়ের সেই দেড় ঘণ্টার শাহবাগ অবরোধকে মনে হয় এক ঐতিহাসিক ট্রেইলার। যে আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল সাধারণ কোটা সংস্কারের দাবিতে, স্বৈরাচারের অহংকার আর বুলেটের আঘাতে তা-ই পরবর্তীতে রূপ নিয়েছিল এক দফার ‘মহাপ্লাবনে’। ৩ জুলাইয়ের সেই তপ্ত দুপুরই মূলত জানান দিয়েছিল— এই বাংলা আর কোনো বৈষম্য মেনে নেবে না।

সর্বশেষ নিউজ