ইতিহাসের পাতায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসটি শুধু একটি ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এটি বাংলাদেশের বুকে এক দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থানের মহাকাব্য। ২০২৪ সালের ৫ জুন যে আন্দোলনের বীজ বপন হয়েছিল, তা-ই ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম দেয়। আজ ৫ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন এক নতুন মাত্রা লাভ করেছিল, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় ঐতিহাসিক ‘জুলাই বিপ্লবে’।
৪ জুলাই আপিল বিভাগ কর্তৃক হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করায় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। আইনি বেড়াজালে কোটা বাতিলের পরিপত্রকে আটকে রাখার এই প্রচেষ্টায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বুঝে যান—দাবি আদায়ের একমাত্র পথ এখন রাজপথ। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ জুলাই থেকে আন্দোলনকারীরা তাঁদের সংগ্রামকে অল-আউট রূপ দিতে শুরু করেন।
জুলাই মধ্যরাতের সেই ঘটনা: সারজিস আলমকে হলছাড়ার অপচেষ্টা
৫ জুলাইয়ের দেশব্যাপী তীব্র প্রতিরোধের পেছনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল ৩ জুলাই দিবাগত মধ্যরাতের এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের আবাসিক ছাত্র ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক সারজিস আলমকে হলছাড়া করার অপচেষ্টা চালায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন পদপ্রত্যাশী নেতা।
রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে মধ্যরাতে সারজিসকে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা মুখ বুজে সহ্য করেননি। খবর ছড়ামাত্রই অমর একুশে হলসহ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের শত শত শিক্ষার্থী লাঠিসোটা ও প্রতিরোধ নিয়ে একুশে হলের সামনে জড়ো হন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ইস্পাতকঠিন ঐক্যের মুখে তৎকালীন ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ ছাত্রনেতারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং মাঝরাতেই সারজিসের কাছে ক্ষমা চায়।
💡 টার্নিং পয়েন্ট: ৩ জুলাই মধ্যরাতের এই বিজয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে আত্মবিশ্বাস এনে দেয় যে—ভয়ের দেয়াল ভাঙা সম্ভব। আর এই আত্মবিশ্বাসই ৫ জুলাইয়ের রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেয়।
৫ জুলাই: দেশজুড়ে ছাত্রসমাজের অভূতপূর্ব প্রতিরোধ
৫ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারটির অধীনে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী প্রচারণা জোরদার করার জন্য অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধের ডাক দেন। ঢাকার বাইরেও তীব্র ছাত্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে:
| বিশ্ববিদ্যালয় (Universities) | ৫ জুলাইয়ের কর্মসূচি (Program Details) | পরবর্তী ঘোষণা ও লক্ষ্য (Next Milestone) |
| ঢাবি, চবি, খুবি, হাবিপ্রবি | ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ। | ৬ জুলাই: দেশব্যাপী সর্বাত্মক প্রতিবাদ কর্মসূচি। |
| যবিপ্রবি, বশেমুরবিপ্রবি, মাভানিপ্রবি | স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থান ও ছাত্র সমাবেশ। | ৭ জুলাই (রোববার): অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন। |
৭ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের এই ডাকই পরবর্তীতে ঐতিহাসিক ‘বাংলা ব্লকেড’-এর পথ সম্পূর্ণ প্রশস্ত করে দেয়।
ইতিহাসের শিক্ষা ও স্বৈরাচার পতনের ভিত্তি
৩ জুলাই মধ্যরাতের সেই হলছাড়া করার চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া এবং ৫ জুলাই দেশজুড়ে সর্বাত্মক অবরোধের মানসিক প্রস্তুতিই প্রমাণ করেছিল—তরুণ সমাজ কোনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না। ৫ জুলাইয়ের সেই তীব্র অসন্তোষ ও ক্লাস বর্জনের ডাকই পরবর্তীতে সারা দেশের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথেছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ৫ আগস্টের স্বৈরাচারী শাসনের পতন। তরুণদের রক্ত ও ত্যাগে লেখা এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে থাকবে।

