আম উৎপাদনে ব্যবহৃত ফ্রুট ব্যাগকে কৃষিপণ্য ঘোষণার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

বর্তমানে নিরাপদ আম উৎপাদনের প্রতিযোগিতা চলছে দেশব্যাপী। নিরাপদ আম উৎপাদন ছাড়াও আমের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো, কৃষকদের কীটনাশক প্রয়োগ বাবদ খরচ কমানো ও বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের লক্ষ্যে আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিবছর বাড়ছে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ব্যবহার। শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ফ্রুট ব্যাগিং।

চলতি বছর জেলায় প্রায় ১৫ কোটির বেশি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আমচাষি ও রপ্তানিকারকরা। তবে চলতি বছর ব্যবহার বাড়ায় গত বছরের তুলনায় ফ্রুট ব্যাগিংয়ের দাম বেড়েছে বলে জানান চাষিরা। এছাড়া ফ্রুট ব্যাগিংয়ের উপর আরোপ করা সরকারি ভ্যাট মওকুফের দাবি জানিয়েছেন বাগান মালিকরা। আবার কৃষিপণ্য ঘোষণা করে আমদানিনির্ভর ফ্রুট ব্যাগিংয়ে সরকারি ভুর্তকি দাবি করেন কৃষকরা।

                                 

পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের মাধ্যমে পরিচর্যার বিকল্প হিসেবে দেশের বাজারে এ পদ্ধতির আমের চাহিদা থাকায় বিক্রি বাড়ে। আর আমদানি করা ব্যাগের প্রায় পুরোটাই আসে চীন থেকে। চলতি বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি পিস ফ্রুট ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে ৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৪ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত। যা গতবছর বিক্রি হয়েছে ৩ টাকা থেকে ৩ টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত দামে। তার আগের বছর দাম ছিল ৩ টাকা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত।

অভিযোগ রয়েছে, আমচাষিদের চাহিদাকে পুঁজি করে নিম্নমানের ফ্রুট ব্যাগ বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে বিপাকে পড়ছেন চাষিরা। ফলে ফ্রুট ব্যাগ ও এর কাঁচামালকে প্রকৃত কৃষিজাত পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে অধিক হারে বাজার মনিটরিং করার দবি জানান কৃষকরা। এতে একদিকে যেমন নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে লাভবান হবে আমচাষি, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা। বর্তমানে ফ্রুট ব্যাগ কৃষিপণ্য ঘোষণা না হওয়ায় তার বাজার মনিটরিং করতে পারছে না কৃষি বিভাগ।

শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিডেটের সাধারণ সম্পাদক ও আম রপ্তানিকারক ইসমাঈল খান শামিম জানান, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানিযোগ্য ও শতভাগ নিরাপদ। কিন্তু অনেক সময় বাজারে থাকা মানহীন ব্যাগের কারণে তা সম্ভব হয় না। আমের ওজন ১০০ গ্রাম হলেই আমে ব্যাগ পরানো হয়। এতে করে কৃষক অন্তত ১০ বার কীটনাশক প্রয়োগের হাত থেকে রক্ষা পায়। এছাড়া ব্যাগিং করা আম আকর্ষণীয়, দাগহীন ও পুরোপুরি কীটনাশকমুক্ত হয়। তাই আমচাষি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও ভোক্তার স্বার্থে ফ্রুট ব্যাগিংকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করার দাবি জানান তিনি।

সম্প্রতি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করেছেন বাগান মালিক সোহান শাহরিয়ার। গণমাধ্যমকে  তিনি বলেন, গত বছর ১০ বিঘার একটি বাগান নিয়েছি। বাগানে ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, ক্ষিরসাপাত জাতের আম রয়েছে। এসব আমে গত ১০ দিন আগে ফ্রুট ব্যাগিং সম্পন্ন করছি। এতে আমে কোনো দাগ থাকে না, বিষ দিতে হয় না, আমের কালারও খুব ভালো আসে।

ফ্রুট ব্যাগিংয়ের শ্রমিক গোমস্তাপুরের মিজানুর রহমান বলেন, আমের সাইজ গুটি থেকে একটু মাঝারি হলেই বাগান মালিকরা ব্যাগিং করা শুরু করেন। গত প্রায় টানা ৭ দিন বিভিন্ন বাগানে ফ্রুট ব্যাগিং করেছি। ২-৩ বছর আগেও এতো বেশি গাছে ব্যাগিং হতো না। তবে চলতি বছর প্রচুর পরিমাণে আমের ব্যাগিং হয়েছে। ছোট, মাঝারি, বড় সাইজের সিংহভাগ গাছেই ব্যাগিং করে অধিক লাভবান হচ্ছেন আমচাষিরা।

শিবগঞ্জ ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবীব গণমাধ্যমকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের সিংহভাগই হয় আশ্বিনা জাতের আমে। এই জাতের আমে যদি ফ্রুট ব্যাগিং না করা হয়, তাহলে অর্ধেক আমই গাছেই পোকায় নষ্ট হয়ে যায়। তবে এখন প্রায় সব জাতের আমেই ব্যাগিং করা হচ্ছে। ফ্রুট ব্যাগিং করা হলেই আম পাড়া পর্যন্ত নিশ্চিত হয়ে থাকা যায়। এমনকি আমে কোনো প্রকার কীটনাশকও প্রয়োগ করতে হয় না। ফলে উৎপাদন খরচও কমে যায়। এমনকি দামও বেশি পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ে আমরা বিভিন্ন মহলে ফ্রুট ব্যাগকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণার দাবি করলেও এর কোনো ফলাফল মেলেনি। যা খুবই দুঃখজনক।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সালেহ মোহাম্মদ ইউসুফ আলী গণমাধ্যমকে বলেন, আমের ওজন ৬০-১০০ গ্রাম হলে ফ্রুট ব্যাগ করার উপযুক্ত সময়। এতে ব্যাগিং করা আমটি অধিক পরিমাণে হলুদ রং ধারণ করে। তবে আম ফ্রেস রাখতে চাইলে ৫০ গ্রাম ওজনের সময় ফ্রুট ব্যাগিং করতে হবে। কৃষক ভাইয়েরা সাধারণ রোগবালাই-ছত্রাক দমন করতে ১২-১৫ কীটনাশক-ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে। কিন্তু ফ্রুট ব্যাগিং করার ফলে আর কোনো কীটনাশক-ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে না এবং খরচও অনেক কমে যাবে। এমনকি আমগুলো পাকার পরে পেড়ে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ছাড়াই সংরক্ষণ করা যাবে ৯ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত।

এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরও বলেন, আম পরিপক্ক হওয়ার আগে-পরে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হয়। এতে আমের গায়ে ছত্রাক দেখা দেয়। ফ্রুট ব্যাগিং করলে তা হওয়ার কোনেনা সুযোগ নেই। বিশেষ ধরনের কাগজের এই ব্যাগে দুটি আস্তরণ রয়েছে। বাইরের আস্তরণটি বাদামী রঙের, আর ভেতরেরটি কালো রঙের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. পলাশ সরকার গণমাধ্যমকে জানান, ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ফলে আমের বাহ্যিক রং খুব আকর্ষনীয় হয়। এতে ক্রেতারা আকৃষ্ট হন। এছাড়াও শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত হয়। তবে চলতি মৌসুমে জেলায় কি পরিমাণ আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছে তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি কৃষি বিভাগ।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, গতবছর জেলায় সাড়ে ১০ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়। তার আগের বছর ৮ কোটি ও ২০২০ সালে জেলায় সাড়ে ৭ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়।

উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছর ৩৭ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। এবছর আমের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০২১ সালে জেলায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আড়াই লাখ মেট্রিক টন এবং তার আগের বছর ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছে।

(এইদিনএইসময়/২৩মে/তাবী)

সর্বশেষ নিউজ