সরকারি চাকরিজীবীরা কেন নিজেরা মারামারি করে

কাজী সায়েমুজ্জামান
spot_img
spot_img

গ্রিক পুরাণ অনুসারে হেলেন ছিলেন স্পার্টার রাজা মেনেলাউসের স্ত্রী। আর ট্রয়ের রাজপুত্র ছিলেন প্যারিস৷ প্যারিস স্পার্টা গেলে হেলেনের সাথে বন্ধুত্ব হয়৷৷ বন্ধুত্ব থেকে পরকিয়া৷ শেষে হেলেনকে নিয়ে স্পার্টা থেকে ট্রয়ে পালিয়ে যান প্যারিস। ওদিকে বউ হারানোর প্রতিশোধ নিতে মেনেলাউস যুদ্ধ ঘোষণা করে৷ ফলে হেলেনকে কেন্দ্র করে ট্রোজান যুদ্ধ হয়।

গল্পের ঘটনাটি তিন হাজার বছরের আগের। হয় হেলেনকে ফেরত দিতে হবে নয় যুদ্ধে লড়তে হবে- এই ঘোষণা দিয়ে এজিয়ান সাগর পাড়ি দেয় এক হাজার জাহাজ। জাহাজ ভর্তি সৈন্য৷ হেলেন তখনও দুনিয়ার সেরা সুন্দরী৷ প্রাচীন গ্রিক শব্দ থেকে হেলেনের নাম রাখা হয়। এর অর্থ জ্বলন্ত কিছু৷ মানে আগুন৷ আর আগুনের মতো এই সৌন্দর্যের কারণেই ধ্বংস নিয়ে আসে হেলেন।

একদিকে প্যারিসের ভাই ট্রয় বীর হেক্টর৷ অন্যদিকে মেনেলাউসের সাথে গ্রিক যোদ্ধা একিলিস৷ সমানে সমানে যুদ্ধ শুরু হয়৷ এক পর্যায়ে নিহত হয় ট্রয় বীর হেক্টর৷  তবে যুদ্ধে সহজে জয়লাভ না করতে পেরে প্রতারণার আশ্রয় নেয় গ্রীকরা । তৈরি করে বিশালাকৃতির এক ঘোড়া। যা ইতিহাসে ‘ট্রোজান হর্স’ নামেই খ্যাত। আর এই ঘোড়াতেই লুকিয়ে থাকে গ্রীক সেনারা৷ এরপর বাকি গ্রিক সৈন্যরা পরাজয়ের ভান করে পাশের একটি দ্বীপে লুকিয়ে পড়ে৷

ট্রয়বাসী যুদ্ধ জয়ের আনন্দ-উল্লাস করতে করতে ঘোড়াটিকে নগরের ভেতরে নিয়ে যায়। আর ভেতরে আত্মগোপন করে থাকা গ্রিক যোদ্ধারা অপেক্ষা করতে থাকে সন্ধ্যা নামার। রাতের গভীরে ঘোড়া থেকে বের হয়ে ট্রয়বাসীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় তারা। খুলে দেয় নগরতোরণ। হাজারো গ্রিক সৈন্য রাজ্যে আগুন ধরিয়ে দেয় গোটা সাম্রাজ্যে। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় একসময়কার সমৃদ্ধ, সাজানো ও সুন্দর নগরী ট্রয়। আগুনে পুড়ে ছাঁই হয় হাজারো সৈন্য আর নিরীহ অধিবাসী। এদিকে একিলিস ছুটে যায় তার বোনকে বাঁচানোর আশায়৷ কিন্তু প্যারিসের ছোড়া তীঁর বিদ্ধ করে একিলিসকে। মারা যান গ্রিক বীর একিলিস।

এটাই গ্রিক পুরানের কাহিনী৷ এতদিন সবাই জানতো এটি একটি পৌরাণিক কাহিনী৷ তবে স্কটিশ সাংবাদিক চার্লস ম্যাকলারেন ১৮২২ সালে সর্বপ্রথম ট্রয় নগরীর সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করলে ঘটনাটি সত্য বলে আবারো আলোচনায় জায়গা করে নেয়। ১৮৭১ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে চারবার খনন করে আবিষ্কৃত হয় ট্রয়ের একাংশ। এটি তুরস্কের মধ্যে পড়েছে৷ তুরস্কের কানাক্কাল প্রদেশের সমুদ্র সৈকতের কাছে এবং আইডা পর্বতের নিচে দার্দানেলিসের দক্ষিণ পশ্চিমে হিসারলিক শহর। এই হিরালিক শহরেই ইতিহাসের ট্রয় নগরী৷

যাই হোক, হেলেনের এই ঘটনা ইতিহাস বা গল্প হলেও এদেশে মাঝে মাঝে সত্যি সত্যি মঞ্চস্থ হয়৷ ঘুরে ফিরে একই কাহিনী৷ দেশবাসী তা দেখে আনন্দ পান৷ ফেসবুকে ঝড় ওঠে৷ সবাই নিজের মতো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন৷ এর আগে হেলেন ছিল মিন্নী৷ এখন একজন পুলিশ অফিসার৷ তবে হেলেনদের নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই৷

কারণটা কী বলছি৷ বাংলাদেশে হেলেনদের পুরাপুরি ছাড় দিয়েছে আইন ও আদালত৷ এটি নিয়ে এর আগেও লিখেছিলাম৷ দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় পরকিয়ার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কোন ব্যক্তি যদি অপর কোন ব্যক্তির সম্মতি বা তাকে কনভিন্স না করে তার স্ত্রীর সাথে পরকীয়া করে তবে পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তির সবোর্চ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড ও যেকোন পরিমাণের জরিমানা বা উভয় দন্ড দেয়া হবে। এক্ষেত্রে মহিলার কোন সাজা হবেনা। পরকীয়া করলেও তাকে অ্যাবেটর বা সহায়তাকারী হিসেবেও ধরা যাবে না। তিনি যতই শিক্ষিত হন না কেন- পরকীয়ায় তার কোন ভূমিকা নেই৷ তিনি একটা পুতুল৷ তিনি হেলেন৷ মোট কথা তিনি নির্দোষ৷ তাকে নিয়ে টানা-হেচড়াকারী দুই পুরুষের মরতে হবে৷ তাদের পক্ষ যারা নেবে তাদেরও একই দশা হবে৷ একজনের হবে জেল৷ আরেকজনের জীবন যেতে পারে মিন্নীর স্বামীর মতো৷

তবে এ ধরনের ঘটনায় মারামারি করা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বিরল৷ কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা সেই রেকর্ড ভেঙেছে৷ শিক্ষিত এই মানুষগুলো এই যে একজন হেলেনকে কেন্দ্র করে মারামারিতে অংশ নিয়ে ন্যাক্কারজনক কাজ করে দেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে- এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার৷ তাহলেই ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল তা বের হয়ে আসত৷ এতে অন্তত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ভবিষ্যতে এ ধরনের মারামারির ঘটনা হতো না৷

লেখক: পরিচালক, দুদক

সর্বশেষ নিউজ