মাগুরা জেলার শ্রীপুরে এক হাড়হিম করা ও চরম পাশবিক অপরাধের চিত্র সামনে এসেছে। সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে কৌশলে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং সেই পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও চিত্র ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার এক জঘন্যতম ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের দায়েরকৃত মামলার প্রেক্ষিতে এজাহারভুক্ত প্রধান ৫ আসামিকে নজিরবিহীন দ্রুততায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আজ রবিবার (২৪ মে ২০২৬) মাগুরা জেলা পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গ্রেপ্তারকৃত ৫ আসামি হলেন—মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার বাসিন্দা মো. সৌরভ (২১), অনিক (১৯), রানা বিশ্বাস (২০), নয়ন শেখ (১৯) এবং মো. হুসাইন।
ব্ল্যাকমেইলিং ও লোকলজ্জার আড়ালে চাপা পড়া ক্ষত
ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর পরিবার ও মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, আসামিরা ওই কিশোরীকে একটি নির্জন স্থানে কৌশলে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে আসামীরা মিলে তাকে জোরপূর্বক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। এই পাশবিক নির্যাতনের সময় সৌরভ ও তার সহযোগীরা মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় পুরো ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করে রাখে।
ধর্ষণ শেষে অবুজ মেয়েটিকে হুমকি দেওয়া হয় যে—এই ঘটনার কথা যদি সে তার বাবা-মা বা বাইরের কাউকে জানায়, তবে ধারণকৃত ওই আপত্তিকর ভিডিও ফেসবুক, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপ সহ সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দেওয়া হবে। আসামিদের এই ভয়ংকর ব্ল্যাকমেইলিং এবং লোকলজ্জার চরম ভয়ে ভুক্তভোগী কিশোরী শুরুতে বিষয়টি নিজের পরিবারের কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখে।
চায়ের দোকানে ধরা পড়ল ভিডিও: কান্নায় ভেঙে পড়ল কিশোরী
নির্যাতনের শিকার মেয়েটি ঘটনাটি চেপে রাখলেও আসামিরা তাদের দেওয়া কুৎসিত হুমকি বাস্তবায়ন করে। গত ১৯ মে সকাল ১১টার দিকে ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর খালু স্থানীয় একটি বাজারের চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় তিনি হঠাৎ দেখতে পান, স্থানীয় কিছু লোকজনের মোবাইল ফোনে ফেসবুক, ইমো এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই তিনি নিজের ভাগ্নিকে চিনে ফেলেন এবং স্তম্ভিত হয়ে যান।
তিনি কালবিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে ভুক্তভোগীর বাড়ি গিয়ে তার পরিবারকে বিষয়টি জানান। পরে ওই কিশোরীর মা উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে মেয়েটিকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। উপস্থিত সকলের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া সেই নারকীয় ও পৈশাচিক নির্যাতনের পুরো বিবরণ দেয় ওই স্কুলছাত্রী।
মায়ের মামলা ও আদালতে ৫ নরপশু
ঘটনার বিস্তারিত জানার পর ভুক্তভোগীর পরিবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে জরুরি আলোচনা সম্পন্ন করে। এরপর গত ২২ মে রাতে ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় ওই ৫ জনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর শ্রীপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস টিম রাতভর মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ৫ জনকেই খাঁচায় বন্দি করতে সক্ষম হয়। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মো. আতাউর রহমান বলেন, “স্কুলছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়ামাত্রই আমরা মামলাটি নথিবদ্ধ করি। মামলার এজাহারভুক্ত ৫ জন আসামিকে ইতোমধ্যেই সফলভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ তাদের কড়া নিরাপত্তায় মাগুরা জেলা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ নিখুঁতভাবে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে।”

