তোমরা মেয়ে দেখ নাই?’ সিলেটের চা–বাগানে তরুণীকে উত্ত্যক্ত ও দীর্ঘ ১ কিমি পিছু নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল; অবশেষে সালিশে ৩ বখাটে আটক

ন্যাশলাল ডেস্ক
spot_img
spot_img

হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর পুণ্যভূমি এবং সবুজে ঘেরা পর্যটন নগরী সিলেটে বেড়াতে এসে চরম হেনস্থা ও নিরাপত্তার সংকটে পড়েছেন ঢাকার এক নারী পর্যটক। সিলেট নগরীর গোয়াবাড়ী এলাকার একটি মনোরম চা–বাগানে দুই ছোট বোনকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তিন যুবকের লালসা ও অশোভন আচরণের শিকার হয়েছেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী। দীর্ঘ ১ কিলোমিটার পথ ধরে ওই তরুণীদের পিছু নিয়ে উত্যক্ত ও অসভ্য আচরণ করার একটি লাইভ ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। পরবর্তীতে স্থানীয়দের ধাওয়ায় অভিযুক্ত ৩ যুবককে আটক করা হলেও পুলিশের আগেই তড়িঘড়ি সালিশ বৈঠক ডেকে মুচলেকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

গত শনিবার (৩০ মে ২০২৬) ভুক্তভোগী তরুণী নিজের ফেসবুক আইডিতে এই লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার দীর্ঘ ভিডিও এবং একটি আবেগঘন পোস্ট শেয়ার করার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার তীব্রতায় সিলেটের পর্যটন এলাকায় নারী নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

১ কিলোমিটার জুড়ে তাণ্ডব: ক্যামেরার সামনে পোজ ও ধূমপান

ভুক্তভোগী তরুণী জানান, তিনি তাঁর দুই ছোট বোনকে সাথে নিয়ে সিলেটের গোয়াবাড়ী চা-বাগান এলাকায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর থেকেই একদল বখাটে যুবক তাদের পিছু নেয় এবং একের পর এক কুৎসিত মন্তব্য ছুঁড়তে থাকে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে ও প্রমাণ রাখতে তরুণী নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ ও লাইভ শুরু করেন।

ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, নির্জন পাহাড়ি পথে চলার সময় যুবকেরা অবিরতভাবে তাদের অনুসরণ করছে এবং কুরুচিপূর্ণ কটূক্তি ছুড়ে দিয়ে বিরক্ত করছে। ভিডিওর একপর্যায়ে ভুক্তভোগী তরুণী চরম ক্ষোভ ও আতঙ্কের সাথে বখাটেদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, ‘তোমরা মেয়ে দেখো নাই?’ কিন্তু তাতেও বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে উল্টো এক যুবককে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে ক্যামেরার সামনে এসে পোজ দিতে এবং আরেকজনকে আয়েশ করে ধূমপান করতে দেখা যায়। প্রায় এক কিলোমিটার পথ ধরে এই নারকীয় মানসিক নির্যাতন চললেও চা-বাগান এলাকায় নিরাপত্তার কোনো বালাই ছিল না এবং আশপাশে থাকা কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।

‘সিলেট ভ্রমণের পরামর্শ আর কাউকে দেব না’—তরুণীর তীব্র ক্ষোভ

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর ভুক্তভোগী তরুণীর দুই ছোট বোন চরম মানসিকভাবে ভীত, আতঙ্কিত ও মারাত্মকভাবে বিব্রত হয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ তরুণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিলেটের পর্যটন সংস্কৃতির সমালোচনা করে লেখেন, “এভাবেই কি সিলেটে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়? আমি আর কোনোদিন কাউকে গর্ব করে সিলেট ভ্রমণের পরামর্শ দিতে পারব না।”

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার সাথে সাথেই নেটিজেনরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আজিজ খান সজিব দাবি করেন, ভিডিওটি দেখার পর তাঁরা স্থানীয় যুবকদের নিয়ে দ্রুত মাঠে নামেন এবং রাতেই স্থানীয়দের সহযোগিতায় ধাওয়া দিয়ে অভিযুক্ত ৩ বখাটেকে শনাক্ত করে আটক করতে সক্ষম হন।

পুলিশের আগে সালিশ! সীমানা জটিলতার অজুহাতে অভিভাবকদের জিম্মায় মুক্তি

ঘটনার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে তড়িঘড়ি করে একটি সালিশ বৈঠক ডাকা হয়। টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সৈয়দ কাওছার আহমদ জানান, খবর পেয়ে তিনি নিজেও সেই সালিশে উপস্থিত ছিলেন। সালিশি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করার কঠোর শর্তে এবং পরবর্তীতে মূল মামলা হলে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার লিখিত অঙ্গীকারনামা রেখে অভিযুক্ত ৩ যুবককে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই বিষয়ে জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল হাবীব বলেন, “ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর আমাদের টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং অভিযুক্তদের শনাক্তে কাজ শুরু করে। তবে ঘটনাটি মূলত আমাদের জালালাবাদ থানা এলাকার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে হওয়ায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে কিছুটা আইনি সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।”

অন্যদিকে, সিলেট মহানগরের বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “নারী পর্যটককে উত্ত্যক্তের ভিডিও পাওয়ার পর আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছি। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতারা মিলে একটি সালিশ বৈঠক সম্পন্ন করে ফেলেছেন।” পুরো বিষয়টি নিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম তীব্র হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ভিডিওর তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে খুব শীঘ্রই প্রয়োজনীয় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পর্যটন ও চা–বাগান এলাকায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি ও টহল জোরদার করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ নাগরিকেরা।

সর্বশেষ নিউজ