খুলনায় দিনদুপুরে বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

খুলনা মহানগরীতে যখন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিশেষ যৌথ অভিযান জোরকদমে চলমান, ঠিক তখনই দিনদুপুরে এক লোমহর্ষক ও প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নগরের লবণচরা থানা এলাকায় রফিকুল ইসলাম (৩৫) নামের এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। আজ ১২ জুন (শুক্রবার) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লবণচরা থানার প্রত্যন্ত মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে অত্যন্ত জনাকীর্ণ পরিবেশে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে।

চলমান মেগা যৌথ অভিযানের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই এমন প্রকাশ্য ও দুঃসাহসিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ নগরবাসী ও রাজনৈতিক মহলের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। নিহত রফিকুল ইসলাম বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির অন্যতম সক্রিয় নেতা ছিলেন।

কাজীপাড়া বাজারে যেভাবে চললো মৃত্যুমিশন

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ শুক্রবার জুমার নামাজের কিছু আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লবণচরা থানার কাজীপাড়া বাজারের একটি দোকানে বসে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলছিলেন রফিকুল ইসলাম। ঠিক সেই সময় আকস্মিকভাবে একটি মোটরসাইকেলে চড়ে হেলমেট পরা এক অজ্ঞাতনামা সশস্ত্র দুর্বৃত্ত বাজারের ওই দোকানের সামনে এসে থামে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তটি রফিকুলকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তলপেটে সরাসরি গুলি করে। গুলি করার পর মুহূর্তের মধ্যে মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে খুনি দ্রুত গতিতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

গুলির বিকট শব্দে বাজারের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে ছুটোছুটি শুরু করেন। পরে রফিকুল ইসলামকে গুরুতর রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের জন্য তাঁর মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়।

কে এই ‘ঢাকাইয়া রফিক’? কী তাঁর পরিচয়?

নিহত রফিকুল ইসলামের স্থায়ী বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামেও বেশ পরিচিত ছিলেন। বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এর পাশাপাশি তিনি ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিএনপির একাধিক শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ছবি রয়েছে।

বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব আসাবুর রহমান হাওলাদার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “রফিকুল ইসলাম আমাদের বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ সদস্য ছিলেন এবং তাঁর নিজস্ব ফেসবুক আইডিতেও এই রাজনৈতিক পরিচয় সুস্পষ্টভাবে দেওয়া আছে।”

তদন্তে নেমেছে পুলিশ, খুনিদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান

হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ বিভাগ) রেজাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “আজ জুমার নামাজের আগে লবণচরা থানার প্রত্যন্ত এলাকার একটি বাজারে রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বসে থাকা অবস্থায় মোটরবাইকে এসে হেলমেট পরা এক দুর্বৃত্ত তাঁর তলপেটে গুলি করে পালিয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।”

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, নিহত রফিকুল ইসলাম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসার সুবাদে বছরের বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করতেন। মাঝেমধ্যে তিনি খুলনার নিজস্ব এলাকায় আসতেন। তিনি পাথরের ব্যবসার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো ব্যবসায়িক বা দলীয় কোন্দল রয়েছে কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। একই সাথে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুর্বৃত্তকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম খুলনার বিভিন্ন প্রবেশপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলে সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী ও অপরাধী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। চলমান যৌথ অভিযানের মাঝেই এই বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনাটি প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ