রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় অতর্কিতে ভারী ইট ছুড়ে মেরে নৃশংসভাবে গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীকে আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মো. ফয়সাল ওরফে কালু (২৭) নামের ওই গ্যাং লিডার ও মাস্টারমাইন্ডকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৪)। গতকাল ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় কাফরুল থানা এলাকায় এক ঝটিকা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাকে আটক করা হয়।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে র্যাব-৪ এর একটি দায়িত্বশীল সূত্র এই চাঞ্চল্যকর আটকের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। সিসিটিভি ফুটেজে ধারণকৃত এই বর্বরোচিত হামলার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় ও র্যাবের ছায়া তদন্ত
র্যাব জানায়, সম্প্রতি রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে চলন্ত অবস্থায় একজন মোটরসাইকেল চালকের মাথায় দূর থেকে সজোরে ইট ছুড়ে মেরে রক্তাক্ত ও অবশ করে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অত্যন্ত রোমহর্ষক ও নৃশংস এই ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও আলোচনার সৃষ্টি করলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তাৎক্ষণিক ছায়া তদন্ত শুরু করে র্যাব-৪।
পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং মাঠ পর্যায়ের নিজস্ব নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত প্রধান অপরাধীর অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। এরপর কাফরুল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল হোতা কালুকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন র্যাব সদস্যরা।
ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে এই রক্তক্ষয়ী মৃত্যুফাঁদ
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবকে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে ফয়সাল ওরফে কালু। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এটি কেবল সাধারণ কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে ছিল গভীর এক পুরনো শত্রুতা। ভুক্তভোগী মোটরসাইকেল চালক রাফির সঙ্গে ব্যবসায়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অভিযুক্ত কালু ও তার চক্রের আগে থেকেই তীব্র বিরোধ চলে আসছিল। এমনকি ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগেও এই ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি হয়েছিল।
সেই ক্ষোভ থেকেই ঘটনার দিন রাফি একা মোটরসাইকেল চালিয়ে কাফরুলের সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় কালু, পারভেজ এবং তাদের সাথে থাকা আরও বেশ কয়েকজন সহযোগী মিলে প্রথমে তার গতিপথ রোধ করার চেষ্টা করে। রাফি তখন মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে কালুর ব্যারিকেড পেরিয়ে চলে যেতে উদ্যত হন। রাফিকে থামাতে ব্যর্থ হয়ে কালু সংকেত দিলে, কিছুটা সামনে ওত পেতে থাকা তার অন্য সহযোগী পারভেজ একটি বড় ভারী ইটের টুকরো সরাসরি চলন্ত অবস্থায় রাফির মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে।
সজোরে ইটের আঘাতে রাফির হেলমেট ভেঙে মাথা ফেটে যায় এবং তিনি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে শক্ত পিচঢালা রাস্তায় পড়ে গিয়ে গুরুতর জখম হন। ঘটনার আকস্মিকতায় রাফি অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা দ্রুত রক্তক্ষরণ হওয়া রাফিকে উদ্ধার করে নাটকীয়ভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাফির মাথায় একটি জটিল অস্ত্রোপচার বা সার্জারি করা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
বাকি আসামিদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান
র্যাব আরও জানায়, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য আসামিদের পরিচয় ইতিমধ্যেই শনাক্ত করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনাকারী কালুকে আটকের পর এই চক্রের বাকি সদস্য, বিশেষ করে সরাসরি ইট নিক্ষেপকারী পারভেজসহ অন্য সহযোগীদের গ্রেফতার করতে কাফরুল ও মিরপুরের বিভিন্ন সম্ভাব্য আস্তানায় র্যাবের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আটককৃত ফয়সাল ওরফে কালুর বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়েরসহ পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

