চিকিৎসা অবহেলায় রোগী বা নবজাতকের মৃত্যু বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু গত ১১ জুন রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিলের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—অতীতে বড় বড় নামী ও কর্পোরেট হাসপাতালে একই ধরণের, এমনকি এর চেয়েও ভয়ংকর প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির পরও যেখানে লাইসেন্স ছোঁয়া হয়নি, সেখানে দেশের অন্যতম বৃহৎ ‘গরীবের হাসপাতাল’ খ্যাত আদ্-দ্বীনকে কেন এক ঝটকায় বন্ধ করে দেওয়া হলো? ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য পুরো একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেওয়া কি আদৌ কোনো স্থায়ী সমাধান, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো সমীকরণ?
সেই কালো রাতের ঘটনা ও তদন্তের সত্যতা
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ মে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬টি নবজাতক শিশু শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম ৩টি গাফিলতি খুঁজে পায়:
-
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড় ও এসি বিকল: মাত্র ৯০০ বর্গফুটের একটি ছোট রুমে ধারণক্ষমতার বাইরে ১১ জন শিশু এবং তাদের অভিভাবকসহ প্রায় ৫০ জন মানুষ গাদাগাদি করে ছিল। দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ভেন্টিলেশন না থাকায় রুমে কার্বন ডাই-অক্সাইড বিষাক্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
-
অন-ডিউটি ডাক্তারের অনুপস্থিতি: এই চরম সংকটের মুহূর্তে ওয়ার্ডে কোনো অন-ডিউটি চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। নার্স ও স্টাফদের চরম অবহেলা প্রমাণিত হয়।
-
অবকাঠামোগত ত্রুটি: ৭০০ বেডের এই হাসপাতাল ভবনটি চিকিৎসাসেইবার জন্য ‘অনুপযুক্ত’ এবং প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ ফায়ার সেফটি লাইসেন্সও ছিল না।
এই তদন্তের পর কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করে এবং রোগীদের স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: আইন কি সবার জন্য সমান?
৬টি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না এবং দোষীদের ফাঁসি বা সর্বোচ্চ সাজা হওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন আইনের ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী নীতি নিয়ে। বিগত কয়েক বছরের ৩টি বড় ঘটনার সাথে আদ্-দ্বীনের অ্যাকশনের তুলনা করলেই সেই বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
দেশের প্রধান হাসপাতালগুলোর দুর্ঘটনা ও সরকারি অ্যাকশনের তুলনামূলক চিত্র:
| হাসপাতালের নাম ও বছর | ঘটনার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতি | সরকারি অ্যাকশন ও বর্তমান অবস্থা | আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও দণ্ড |
| ইউনাইটেড হাসপাতাল (২০২০) | করোনা আইসোলেশন ইউনিটে এসি বিস্ফোরণে আগুন লেগে লাইফ সাপোর্টে থাকা ৫ রোগী পুড়ে মারা যান। ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা ছিল না। | লাইসেন্স বাতিল হয়নি। হাসপাতাল আজও পুরোদমে সচল। | উচ্চ আদালতের নির্দেশে ভুক্তভোগী পরিবারকে ৩০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়। |
| সেন্ট্রাল হাসপাতাল (২০২৩) | ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতি আঁখি ও তার নবজাতকের মৃত্যু। চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান। | লাইসেন্স বাতিল হয়নি। শুধু ওটি ও আইসিইউর কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ করা হয়েছিল। | চিকিৎসকদের গ্রেপ্তার ও ওটি সাময়িক বন্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল। |
| শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল (২০২৪) | বিদ্যুৎ বিভ্রাটে লিফটে ৪৫ মিনিট আটকে থেকে অক্সিজেনের অভাবে হৃদরোগীর মৃত্যু। | কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তি নেই। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় পার পেয়ে যায়। | কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। |
| মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল (২০২৬) | এসি বন্ধ ও ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে অক্সিজেনের অভাবে ৬ নবজাতকের মৃত্যু। | পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল ও শাটডাউনের নির্দেশ। | ক্ষতিপূরণের বা সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ। |
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া: পুনর্বিবেচনার জোর দাবি
আদ্-দ্বীন বন্ধের এই নজিরবিহীন কঠোর সিদ্ধান্তের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে ‘অন্যায্য’ এবং ‘একচোখা’ সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিয়েছে।
১. ‘গরীবের হাসপাতাল’ বন্ধে সাধারণ মানুষের ওপর আঘাত
বিগত ছাব্বিশ বছরে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল থেকে প্রায় ২ কোটির মতো মানুষ চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। দেশের বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর খরচ যেখানে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, সেখানে আদ্-দ্বীন ছিল নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ‘লাইফলাইন’। হাসপাতালটি বন্ধ করায় অপরাধী চিকিৎসকদের শাস্তি দেওয়ার বদলে পরোক্ষভাবে হাজার হাজার দরিদ্র রোগীকে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
২. রাজনৈতিক মহলের শক্ত অবস্থান
-
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান: ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “তদন্তের মাধ্যমে কোনো অবহেলা বা অপরাধ চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তা না করে লাইসেন্স বাতিল করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া কাম্য নয়। এর শেষ ক্ষতি জনগণেরই হলো।” একই সাথে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা মানবিক বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
-
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান: তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “বিগত ছাব্বিশ বছরে এই হাসপাতালে বড় ধরণের কোনো দুর্ঘটনার নজীর নাই। হাসপাতালের ত্রুটি থাকলে জরিমানা করা যেতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা যাবে না। স্বাস্থ্য খাতকে অরাজকতা থেকে বাঁচাতে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।”
-
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ: তিনি বলেন, “তদন্ত ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় ১১ জুন পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার জন্য পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।”
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অন্ধকার: ৪টি বড় বিপর্যয়
আদ্-দ্বীনের এই আকস্মিক ‘শাটডাউন’ বা বন্ধের সিদ্ধান্ত চিকিৎসাসেবার বাইরেও এক বিশাল সামাজিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে:
-
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত: আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজে বর্তমানে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী এমবিবিএস কোর্সে অধ্যয়নরত। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় তাদের নিয়মিত ক্লাস, ক্লিনিক্যাল ওয়ার্ড এবং ইন্টার্নশিপ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অন্ধকারে।
-
হাজারো কর্মীর বেকারত্ব: হাসপাতালটিতে প্রায় হাজার খানেক ডাক্তার, নার্স ও স্টাফ কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বন্ধ হলে এই হাজারো পরিবার এক লহমায় বেকার হয়ে পড়বে।
-
চিকিৎসাধীন রোগীদের জীবনঝুঁকি: সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন হঠাৎ করে লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ দেওয়ায় সেখানে চিকিৎসাধীন শত শত রোগীর জীবন সংকটে পড়েছে। অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের ধকল সইতে না পেরে অনেক আশঙ্কাজনক রোগীর প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
-
সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ: ঢাকা মেডিকেল বা সলিমুল্লাহ মেডিকেলের মতো সরকারি হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যেই ধারণক্ষমতার বাইরে। আদ্-দ্বীনের প্রতিদিনের হাজার হাজার রোগীর চাপ নেওয়ার মতো ক্ষমতা দেশের বর্তমান ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নেই।
সমাধান কি সংহারে, নাকি সংস্কারে?
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও চিকিৎসাগত বড় বড় ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেসব দেশের সরকার কখনোই পুরো হাসপাতাল রাতারাতি বন্ধ করে দেয় না। তারা যেটা করে, তা হলো—নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের জীবাণুনাশকরণ (Sterilization), ত্রুটি সংশোধন, দায়ীদের লাইসেন্স বাতিল এবং হাসপাতালকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা।
আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে প্রতিটির জন্য ৮০ লক্ষ টাকা করে মোট ৪ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণভাবে বেশ কয়েকজন স্টাফকে চাকরিচ্যুত করেছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল বা রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পাবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের স্বার্থে আপিল চলাকালীন চিকিৎসাসেবা চালু রাখার অনুমতি চেয়েছে।
৬টি নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের ফাঁসি বা সর্বোচ্চ জেল নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। কর্পোরেটদের জন্য আইনের এক নিয়ম, আর অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্য নিয়ম—আইনের এই প্রকাশ্য ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও গভীর আস্থার সংকটে ফেলবে। দেশের চিকিৎসা মানচিত্রে এই বিশাল শূন্যতা তৈরি না করে, কঠোর তদারকির মাধ্যমে আদ্-দ্বীনকে সংস্কার করার সুযোগ দেওয়াই হবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে জনবান্ধব ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

