সফল পতাকা বৈঠকের পর কুষ্টিয়া সীমান্তে শূন্যরেখা থেকে সেই ১২ জনকে সরিয়ে নিলো বিএসএফ

কুষ্টিয়া কার্যালয়
spot_img
spot_img

টানা চার দিনের তীব্র উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা আর খোলা আকাশের নিচে যাপন করা অমানবিক জীবনের অবসান ঘটল। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে থাকা নারী ও শিশুসহ সেই ১২ জন ভারতীয় নাগরিককে অবশেষে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।

আজ সোমবার (১৫ জুন) বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফ-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত এক জরুরি ও ফলপ্রসূ পতাকা বৈঠকের পর ওই ১২ জনকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কুষ্টিয়ার ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি আজ দুপুরে এই স্বস্তিদায়ক তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সীমান্তের ১৫০ পিলারের সফল বৈঠক

বিজিবি অধিনায়ক জানান, সোমবার সকালে সীমান্তের ১৫০ এর ৩এস পিলারের নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক সীমান্ত লাইনে এই বিশেষ পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবির পক্ষে দক্ষ নেতৃত্ব দেন ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা। অন্যদিকে ভারতীয় বিএসএফ্-এর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন রানীনগর বিএসএফ ক্যাম্পের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট (এপি) সুনীল কুমার যাদব।

বৈঠকে বিজিবি ও বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত জোরালো আলোচনার পর, শূন্যরেখায় চার দিন ধরে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটানো ১২ জনকে সসম্মানে ফিরিয়ে নিতে শেষ পর্যন্ত সম্মত হয় বিএসএফ। আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুরের আগেই তারা ওই ১২ জনকে নিয়ে নিজেদের ক্যাম্পে চলে যান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও খুলনা: পরিচয় মিলল সেই পরিবারগুলোর

এর আগে গত শুক্রবার ভোরে ৪ জন নারী, ৪ জন পুরুষ ও ৪ জন অবুঝ শিশুকে উপজেলার চরবিলগাথুয়া সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশী ভূখণ্ডে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। স্থানীয় জনতা তাৎক্ষণিকভাবে টের পেয়ে বিজিবিকে জানালে পুশইন প্রতিরোধ করা হয়। এরপর থেকেই তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকা পড়েন।

আটকে থাকা অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আলাপকালে ওই ব্যক্তিরা জানান, তারা মূলত ৩টি আলাদা পরিবারের সদস্য। এর মধ্যে ৫ সদস্যের একটি পরিবারের আদি বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে, ৪ সদস্যের একটি পরিবারের বাড়ি সাতক্ষীরায় এবং ৩ সদস্যের আরেকটি পরিবারের বাড়ি খুলনায় বলে তারা দাবি করেছিলেন। জীবিকার তাগিদে বা কোনোভাবে তারা ভারতে চলে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খোলা আকাশ ও কাঁটাতার: বাংলাদেশিদের অনন্য মানবিকতা

চার দিন ধরে মাথার ওপর প্রখর রোদ, তীব্র গরম আর চারপাশে সীমান্তের কাঁটাতারই যেন এই অসহায় মানুষগুলোর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অপেক্ষায় দিন-রাত পার করতে গিয়ে ১ থেকে দেড় বছর বয়সী এক শিশুসহ অনেকেই প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

তবে এই কঠিন সময়েও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার সীমান্তবাসী। বিজিবির কঠোর নজরদারির মাঝেই স্থানীয় বাসিন্দারা মানবিক কারণে কৌশলে ওই ১২ জনের কাছে নিয়মিত বিস্কুট, পাউরুটি, তরল দুধ, কলা ও সুপেয় খাবার পানি পৌঁছে দিয়েছেন। এমনকি গ্রামবাসী চাঁদা তুলে তাদের জন্য তিন বেলা ভারী খাবারের ব্যবস্থাও করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও প্রশংসিত হয়েছে।

শনিবারের অস্বীকৃতি ভেঙে সোমবারের বড় জয়

উল্লেখ্য, এর আগে গত শনিবারও এই একই ইস্যুতে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে এক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেই বৈঠকে বিএসএফ কোনোভাবেই এই ১২ জনকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে বা ফিরিয়ে নিতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানায়। তবে বিজিবির ৪৭ ব্যাটালিয়নের শক্ত অবস্থান, সীমান্ত জুড়ে কড়া নজরদারি ও বিজিবির জোরালো কূটনৈতিক চাপের মুখে সোমবারের বৈঠকে বিএসএফ তাদের ভুল স্বীকার করে নমনীয় হতে বাধ্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১২ জনকে সরিয়ে নিলো। এর ফলে সীমান্ত জুড়ে বিরাজ করা গত চার দিনের টানটান উত্তেজনা ও আতঙ্কের অবসান ঘটল।

সর্বশেষ নিউজ