কুমিল্লায় ধর্ষণ ও ভ্রুণ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছাত্রশিবির নেতা জিসান প্রধান কারাগারে প্রেরণ

কুমিল্লা কার্যালয়
spot_img
spot_img

কুমিল্লায় এক বিধবা নারীকে একাধিকবার ধর্ষণ ও ওষুধ খাইয়ে ভ্রূণ নষ্ট করার চাঞ্চল্যকর মামলায় অভিযুক্ত ছাত্রশিবির নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে আদালতে হাজির করার পর কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টায় জেলা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কড়া পাহারায় তাকে তড়িঘড়ি করে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক তৈয়ব উদ্দিন আহমেদের আদালতে উঠানো হয়।

আদালতে হাজির করার সময় জিসানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তার মাথায় হেলমেট ও পরনে পুলিশের বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরানো ছিল। শুনানির প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ তাকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রিজন ভ্যানে তুলে কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে ওকালতনামা না দেওয়ার অভিযোগ আইনজীবীর

আদালত থেকে জিসানকে কারাগারে পাঠানোর পর তার প্রধান আইনজীবী মনির হোসেন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা জিসানের অসুস্থতা ও শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাকে সাধারণ সেলের পরিবর্তে কারা হাসপাতালে রাখার জন্য বিজ্ঞ আদালতে আবেদন করেছি। এই সময় আদালত আমাদের কাছে জিসানের সই করা ওকালতনামা চান।”

আইনজীবী আরও অভিযোগ করেন, “আদালতের নির্দেশে আমরা যখন পুলিশ কাস্টডিতে থাকা জিসানের কাছ থেকে ওকালতনামা নিতে যাই, তখন ডিবি ও জেলা পুলিশ আমাদের সেই সুযোগ দেয়নি। তারা তড়িঘড়ি করে সাংবাদিকদের ক্যামেরা এবং আমাদের ধাক্কা দিয়ে জিসানকে প্রিজন ভ্যানে উঠিয়ে ফেলে। পুলিশের এই অতি-তৎপরতা এবং আচরণেই বোঝা যায় তারা এই ঘটনার পেছনে কোনো কিছু লুকাতে চাইছে।”

মামলার এজাহার ও আসামিদের বর্তমান আইনি স্থিতি:

আসামির নাম ও দলীয় পদবী মামলার মূল অভিযোগ গ্রেফতারের তারিখ ও স্থান বর্তমান আইনি অবস্থা
জিসান মিয়া প্রধান (কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক, ছাত্রশিবির)। বিধবা নারীকে একাধিকবার ধর্ষণ ও গর্ভপাত/ভ্রূণ হত্যা। ১২ জুন, ২০২৬ (লাকসাম জংশন এলাকা থেকে উদ্ধার)। কড়া পাহারায় বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ
সেকান্দর, গোলাম রাব্বী ও সজীব হাসান (সহযোগী আসামি)। জিসানকে অপরাধে সহায়তা ও আশ্রয় প্রদান। ১৩ জুন, দাউদকান্দি এলাকা। গত শনিবারই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নিখোঁজ নাকি বিয়ের তারিখ এড়াতে ‘নাটক’?

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১১ জুন রাতে, যখন জিসান হঠাৎ নিখোঁজ হন। জিসানের সন্ধান চেয়ে তার চাচাতো ভাই অ্যাডভোকেট রাসেল আহম্মেদ দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এর ঠিক একদিন পর, গত শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে তাকে উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ ও তার পরিবার। উদ্ধারের পর জিসান নিজেকে মারাত্মক অসুস্থ দাবি করায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কারণেই গত শনিবার অপর তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানো হলেও জিসানকে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হয়।

তবে এই নিখোঁজের ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ সাজানো ‘নাটক’ বলে দাবি করেছে জেলা পুলিশ। গত শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে এক ২৫ বছর বয়সী বিধবা তরুণীর সঙ্গে জিসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্কের একপর্যায়ে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তাকে গর্ভপাতের জন্য চরম চাপ দেন এবং ওষুধ সেবনের মাধ্যমে তার ভ্রূণ নষ্ট করেন।

মামলার বিবরণ ও পুলিশ সুপারের বক্তব্য

পুলিশ সুপার আরও জানান, ভ্রূণ হত্যার পর ওই তরুণী জিসানকে বিয়ের জন্য তীব্র চাপ দিতে থাকেন। নিরুপায় হয়ে জিসান ১২ জুন তাকে বিয়ে করবেন বলে সম্মতি জানান। তবে শেষ মুহূর্তে বিয়ে ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়াতে জিসান নিজেই আত্মগোপনে চলে যান এবং অপহৃত বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে একটি নাটক সাজান।

জিসানকে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পরপরই শুক্রবার রাতে ভুক্তভোগী ওই নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় জিসান প্রধানকে প্রধান আসামি এবং তার তিন সহযোগীকে সহযোগী আসামি করে মোট চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের অভিযোগ আনা হয়। ইতিমধ্যেই মামলার চার আসামির সবাইকেই আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাটি নিয়ে কুমিল্লা জেলাজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ