কুমিল্লায় গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের এক সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে আসামি ধরার কথা বলে মামলার অসহায় বাদীর পরিবারের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার নাম সঞ্জয় সিকদার, যিনি কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) হিসেবে কর্মরত। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে বাদীর বোন সুমি আক্তার এই চাঞ্চল্যকর ও হয়রানিমূলক অভিযোগটি প্রকাশ্যে এনেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মাশিকারা এলাকার সরকার বাড়িতে পারিবারিক বিরোধের জেরে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে একই পরিবারের চারজনকে গুরুতর আহত করার একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আহত রুবি আক্তার বাদী হয়ে কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে নির্দেশ দিলে তদন্তভার পান এসআই সঞ্জয় সিকদার। আর এর পরেই শুরু হয় আসামি ধরার নামে বাদীর পরিবারকে আর্থিক হয়রানির পালা।
সুদ ও লোন নিয়ে ৪০ হাজার টাকা দিলেন দিনমজুর বাবা!
মামলার বাদী রুবি আক্তারের বোন সুমি আক্তার গণমাধ্যমকে ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, “গত ৪ মে আমার বোন রুবি আক্তার কুমিল্লার আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর একদিন তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর সঞ্জয় সিকদার আমাদের বাড়িতে আসেন। ওই দিন আমরা অত্যন্ত কষ্ট করে উনাকে যাতায়াত খরচ বাবদ দুই হাজার টাকা দিয়েছিলাম।”
সুমি আরও বলেন, “এর কয়েকদিন পর এসআই সঞ্জয় সিকদার আমাদের সোহাগ ওরফে শিবু নামের এক ব্যক্তির মোবাইল নাম্বার দিয়ে বলেন, ‘আসামি ধরতে হলে উনার সাথে যোগাযোগ করুন।’ এরপর আমরা শিবুকে ফোন দিলে তিনি দুই দিনের মধ্যে সমস্ত প্রধান আসামিদের ধরিয়ে দেওয়ার গ্যারান্টি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। নিরুপায় হয়ে আমি এবং আমার বৃদ্ধ বাবা গফুর মিয়া চড়া সুদে লোন (ঋণ) করে শিবুর হাতে ৪০ হাজার টাকা তুলে দিই। কিন্তু আজ দেড় মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও ডিবি পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেফতার করেনি, বরং উল্টো আমাদের ঘোরাচ্ছে।”
আসামি ধরার নামে ডিবি পুলিশের অর্থ লেনদেনের বিবরণী:
| ভুক্তভোগী ও মামলার স্থান | অভিযুক্ত পুলিশ ও সহযোগী | দাবিকৃত ও আদায়কৃত অর্থ | বর্তমান অবস্থা ও ডিবির সিদ্ধান্ত |
| রুবি আক্তার ও পরিবার (দেবিদ্বার, কুমিল্লা) | এসআই সঞ্জয় সিকদার ও সহযোগী সোহাগ শিবু। | দাবি: ৫০,০০০ টাকা। আদায়: ৪২,০০০ টাকা (লোন করা)। | দেড় মাসেও আসামি গ্রেফতার শূন্য; তদন্তের নির্দেশ। |
“সব স্যারের খাতায় লেখা আছে”: মধ্যস্থতাকারীর চাঞ্চল্যকর তথ্য
টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর সঞ্জয় সিকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বর্তমানে একটি জরুরি কাজে কুমিল্লা আদালতে অবস্থান করছি। টাকা লেনদেনের বিষয়ে সোহাগ ওরফে শিবুকে আপনাদের কাছে পাঠাচ্ছি। সে-ই সরাসরি আপনাদের সাথে দেখা করে বিস্তারিত কথা বলবে।”
পরবর্তীতে বাদীর পরিবারের কাছ থেকে ঠিক কত টাকা নেওয়া হয়েছে— এ বিষয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হলে মধ্যস্থতাকারী সোহাগ ওরফে শিবু এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁদেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “টাকা-পয়সার সব হিসাব স্যারের (এসআই সঞ্জয় সিকদার) কাছে খাতায় নিখুঁতভাবে লেখা আছে।” শিবুর এমন বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আসামি গ্রেফতারের নামে পুলিশের এই ঘুষ বাণিজ্য বেশ পরিকল্পিতভাবেই চলছিল।
অ্যাকশনে ডিবি ওসি: ভুক্তভোগী পরিবারকে তলব
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সংস্থার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠায় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই বিষয়ে কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহআলম শামসুল তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
ডিবি ওসি মো. শাহআলম শামসুল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “ফ্যাসিবাদ পরবর্তী এই স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতি বা অনিয়মকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আমি ভুক্তভোগী পরিবারকে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে সরাসরি আমার কার্যালয়ে আসার জন্য বলেছি। আমাদের কোনো কর্মকর্তা যদি আসামি গ্রেফতারের নামে এমন কোনো অনৈতিক কাজ বা অর্থ গ্রহণ করে থাকেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

