ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সাত দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর: সচেতন গ্রাহক ফোরাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার এবং বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের দখলদারিত্ব অবসানের লক্ষ্যে উত্থাপিত ৭ দফা দাবির সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। গতকাল বুধবার (১৭ জুন) সকালে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের শীর্ষ নেতাদের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে গভর্নর এই ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেন।

বৈঠক শেষে সংগঠনের আহ্বায়ক নুর উন নবী সাংবাদিকদের জানান, গত মঙ্গলবার ইসলামী ব্যাংকের ভুক্তভোগী শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে গভর্নরের কাছে ৭ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে গভর্নর তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহক ফোরামের নেতাদের বৈঠকে ডাকেন। গতকাল দুপুরে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যসচিব মোতাছিম বিল্লাহের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও এই ফলপ্রসূ বৈঠকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

চেয়ারম্যান নিয়োগে কঠোর শর্ত: আর্থিক কেলেঙ্কারিযুক্ত কেউ থাকতে পারবে না

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের আহ্বায়ক নুর উন নবী স্পষ্ট করে বলেন, “ইসলামী ব্যাংকে আগামী দিনে এমন কোনো ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না, যিনি অতীতে কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিংবা যার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের কোনো অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে যাদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে, তাদেরকেও শতভাগ নৈতিক, আদর্শিক এবং রাজনৈতিকভাবে দলনিরপেক্ষ হতে হবে।”

তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, ৭ দফা দাবি শতভাগ মেনে নিয়ে যদি ইসলামী ব্যাংকের একটি স্বচ্ছ ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়, তবে সচেতন গ্রাহক ফোরাম দেশের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। এটি আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে ইসলামী ব্যাংকের হারানো গৌরব ও ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রায় অনন্য ভূমিকা রাখবে।

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দফা দাবির খতিয়ান:

ক্রমিক মূল দাবি ও এজেন্ডা লক্ষ্য ও কার্যকারিতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত
পেশাদার ও স্বাধীন পর্ষদ গঠন সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ অংশীজনদের পরিচালক করা। গভর্নর নীতিগতভাবে একমত।
প্রকৃত ও আদি মালিকানা হস্তান্তর ২০১৭ সালে জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া মালিকানা ফেরত। আইনি প্রক্রিয়া পর্যালোচনার আশ্বাস।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও কঠোর বিচার এস আলমসহ হাজার কোটি টাকা লুটকারীদের বিচার। বিচার বিভাগীয় পদক্ষেপের তাগিদ।
অপপ্রচার রোধ ও আইনি ব্যবস্থা ব্যাংকিং খাতের আতঙ্ক দূর ও প্রোপাগান্ডা বন্ধ। বিএফআইইউ ও সিআইডিকে নির্দেশনার উদ্যোগ।
সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও অর্থ উদ্ধার লুটেরাদের সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যাংকের দেনা শোধ। বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা।
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন চিহ্নিত লুটেরা ও তাদের পরিবারকে আজীবন নিষিদ্ধ করা। ধারা ১৮/ক সংশোধনের জন্য সুপারিশ।
সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার। ফোরামের রাজনৈতিক ও সংসদীয় দাবি।

এস আলমের লুটপাটের বিচার ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার আলটিমেটাম

গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর কাছে পেশ করা স্মারকলিপিতে বিদায়ী ফ্যাসিবাদের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এস আলম গ্রুপসহ যারা ইসলামী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নামসর্বস্ব ঋণের নামে লুট করেছে, তাদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।

একই সাথে বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার এবং অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরা সিন্ডিকেটের স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে ব্যাংকের আমানতকারীদের দেনা শোধ করার দাবি জানানো হয়। গ্রাহক ফোরামের নেতারা ব্যাংকিং খাতের আতঙ্ক দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যেকোনো ধরণের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকার অনুরোধও জানান।

আইন সংশোধন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি

দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮/ক ধারা সংশোধন করা। ফোরাম দাবি তুলেছে, এই ধারা সংশোধন করে চিহ্নিত লুটেরা, তাদের পরিবার এবং সুবিধাভোগীদের ব্যাংকিং খাতের পরিচালক পর্ষদে বসার যোগ্যতা আজীবনের জন্য কেড়ে নিতে হবে।

তাছাড়া, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। নুর উন নবী জানান, গভর্নর এই সমস্ত দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ এই ব্যাংকের আমানত সুরক্ষায় দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সর্বশেষ নিউজ