বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। মধ্যপ্রাচ্য তথা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিকে কয়েক দশক ধরে অস্থিতিশীল করে রাখা দুই চিরবৈরী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি চুক্তি-র প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (ইসলামাবাদ এমওইউ) স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে এই মেগা খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত ৭ দেশের জোট জি৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্যারিসে অবস্থান করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার রাতে বিশ্বখ্যাত ভার্সাইলিস প্রাসাদে আনুষ্ঠানিক নৈশভোজের ঠিক আগমুহূর্তে তিনি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ওই সময় তাঁর পাশে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর পরই ইরানের রাজধানী তেহরানে নিজ দপ্তরে বসে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে চূড়ান্ত সিলমোহর দেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) পেজেশকিয়ানের চুক্তি স্বাক্ষরের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছে।
৮০০ শব্দের মাস্টারস্ট্রোক: কী আছে ১৪ পয়েন্টের চুক্তিতে?
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৪টি পয়েন্ট সংবলিত এই ‘ইসলামাবাদ এমওইউ’ আকারে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি সমঝোতা স্মারক হলেও এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য আকাশচুম্বী। মাত্র ৮০০ শব্দের এই ঐতিহাসিক দলিলটি মূলত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ওয়াশিংটন-তেহরান স্নায়ুযুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের প্রথম সুনির্দিষ্ট চাবিকাঠি। এটি দুই পক্ষকে একটি স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় শান্তি চুক্তি-র দিকে ধাবিত করার আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ বা পথনকশা হিসেবে কাজ করবে।
ইসলামাবাদ এমওইউ (Islamabad MoU)-এর মূল শর্ত ও রোডম্যাপ:
| চুক্তির প্রধান এজেন্ডা | যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি | ইরানের প্রতিশ্রুতি | মধ্যস্থতাকারী ও সময়সীমা |
| হরমুজ প্রণালি সচল | আন্তর্জাতিক এই নৌপথের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করবে। | বাণিজ্যিক ও বিদেশি জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করবে। | পাকিস্তান (প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ)। |
| অর্থনৈতিক অবরোধ | ইরানের প্রধান প্রধান বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। | জব্দকৃত তহবিল ও বাণিজ্যের স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। | আগামী ৬০ দিনের জন্য প্রাথমিক চুক্তি কার্যকর। |
| স্থায়ী শান্তি আলোচনা | পরমাণু প্রকল্প ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিয়ে স্থায়ী টেবিল বৈঠক। | ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক শর্তাবলিতে শিথিলতা। | দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠক। |
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক মধ্যস্থতা ও যুদ্ধের নেপথ্য ইতিহাস
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনী ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বেধে যাওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ পারমাণবিক যুদ্ধের মেঘ জমেছিল। টানা ৪০ দিন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক স্থবিরতা চলছিল। এই মহাসংকটকালে দুই দেশের বরফ গলাতে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বাঁচাতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পাকিস্তান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরাসরি তত্ত্বাবধানে গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এই চুক্তির গোপন খসড়া ইরানের কাছে পাঠানো হয়। গত ৬ মে হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা মার্কিন গণমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’কে বলেছিলেন, “আমরা একটি নতুন সমঝোতা চুক্তির খসড়া ইরানের কাছে পাঠিয়েছি এবং আমরা একটি শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় পৌঁছাতে চাচ্ছি।” গতকাল দুই দেশের শীর্ষ নেতার স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ অত্যন্ত স্বস্তি প্রকাশ করে বলেছেন, “অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক চুক্তির সমস্ত শর্তগুলোর বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে শুরু হয়ে যাবে।”
৬০ দিনের কূটনৈতিক রোডম্যাপ: খুলছে হরমুজ প্রণালি
ইসলামাবাদ এমওইউ স্বাক্ষরের ফলে এখন থেকে ওয়াশিংটন এবং তেহরান আগামী ৬০ দিন সময় পাচ্ছে। এই দুই মাসের মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকরা স্থায়ী শান্তি চুক্তি-র চূড়ান্ত বক্তব্য ও কঠিন শর্ত নির্ধারণ, ইরানের বিতর্কিত পরমাণু প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ বাবদ জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসবেন।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, এই ৬০ দিন বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে সমস্ত বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে সম্পূর্ণ অবাধে ও নিরাপদে চলাচল করতে দেবে ইরান। আর তার অবিনাশী প্রতিদান হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর দীর্ঘ দিন ধরে চেপে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেবে হোয়াইট হাউস। বিশ্ববাজার ও কূটনৈতিক মহল এই চুক্তিকে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে।

