১৮ জুন আন্তর্জাতিক দিবস: ঘৃণা বক্তব্য প্রতিরোধ ও টেকসই খাদ্যাভ্যাসের যুগপৎ বার্তা

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

আজ ১৮ই জুন, বিশ্ব ক্যালেন্ডারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। আজ বিশ্বজুড়ে একযোগে পালিত হচ্ছে দুটি ভিন্নধর্মী কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবস। একদিকে যেমন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষ দূর করতে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক ঘৃণা বক্তব্য প্রতিরোধ দিবস’, অন্যদিকে আমাদের চিরচেনা পৃথিবীকে জলবায়ু সংকট ও দূষণ থেকে বাঁচাতে উদযাপিত হচ্ছে ‘টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস’। জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এই দিবস দুটির মূল সুরই হলো— বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা, অংশীদারিত্বের জোরদারকরণ এবং একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ।

১. আন্তর্জাতিক ঘৃণা বক্তব্য প্রতিরোধ দিবস: বিভেদ ভুলে ঐক্যের ডাক

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সংঘাত, যুদ্ধ এবং সামাজিক অস্থিরতার এই কঠিন সময়ে ‘ঘৃণা বক্তব্য’ বা ‘হেট স্পিচ’ (Hate Speech) সমাজে বড় ধরণের সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ প্রবণতা রুখতেই প্রতি বছর ১৮ জুন আন্তর্জাতিক ঘৃণা বক্তব্য প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। ২০১৯ সালের ১৮ জুন জাতিসংঘের ‘স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড প্ল্যান অব অ্যাকশন অন হেট স্পিচ’ চালুর ধারাবাহিকতায়, ২০২১ সালের জুলাই মাসে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এছাড়া, সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের জুনে গৃহীত এ/আরইএস/৭৯/৩১৬ (A/RES/79/316) রেজোলিউশনে আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ এবং সহনশীলতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

অংশীদারিত্ব ও নীরবতা ভাঙার লড়াই (#NoToHate)

জাতিসংঘের বার্তা অনুযায়ী, ঘৃণা বক্তব্য পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাই এর প্রতিরোধে প্রয়োজন সামগ্রিক সামাজিক অংশীদারিত্ব (Whole-of-Society Approach)। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সহনশীলতার বার্তা ছড়াতে হবে। প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে বা দৈনন্দিন আড্ডায় মানুষ ক্ষতিকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায় বা নীরব থাকে। কিন্তু জাতিসংঘের #NoToHate ক্যাম্পেইন বলছে, এই নীরবতা ঘৃণা ছড়াতে আরও সাহায্য করে। ঘৃণা বক্তব্য যেহেতু বড় ধরণের অপরাধের পূর্বলক্ষণ, তাই একে গোড়াতেই উপড়ে ফেলা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।

২. টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস: থালায় পুষ্টি, প্রকৃতিতে স্বস্তি

১৮ জুনের দ্বিতীয় প্রধান বৈশ্বিক আয়োজন হলো ‘টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস’ (Sustainable Gastronomy Day)। ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের A/RES/71/246 রেজোলিউশনের মাধ্যমে ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর ইউনেস্কো (UNESCO) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর যৌথ উদ্যোগে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ‘গ্যাস্ট্রোনমি’ বলতে মূলত কোনো অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশিল্প ও খাদ্যাভ্যাসকে বোঝায়। আর ‘টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি’ হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে খাবার প্লেটে আসার প্রতিটি ধাপে প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

কেন এই দিবসটি বর্তমান যুগের জন্য অপরিহার্য?

কোভিড-১৯ পরবর্তী এই সময়ে পৃথিবী যখন জলবায়ু বিপর্যয়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং চরম দূষণের মুখোমুখি, তখন আমরা কী খাচ্ছি এবং কীভাবে তা উৎপাদিত হচ্ছে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় ও মৌসুমী উপাদান ব্যবহার, ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব রান্না এবং খাদ্য অপচয় রোধ করার মাধ্যমে কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব।

১৮ জুনের দুটি আন্তর্জাতিক দিবসের মূল লক্ষ্য ও রূপরেখা:

আন্তর্জাতিক দিবসের নাম মূল লক্ষ্য ও এজেন্ডা প্রধান সহযোগী ও সংস্থা টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা
ঘৃণা বক্তব্য প্রতিরোধ দিবস বিদ্বেষমূলক বক্তব্য চেনা, প্রতিরোধ করা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। জাতিসংঘ (UN General Assembly) সমাজে শান্তি, সমতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস বর্জ্য কমানো, স্থানীয় ও পুষ্টিকর কৃষিকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশ রক্ষা। ইউনেস্কো (UNESCO) ও এফএও (FAO) খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করা।
ইউনেস্কো ও এফএও-এর বিশেষ বৈশ্বিক উদ্যোগসমূহ

টেকসই খাদ্যাভ্যাস ছড়িয়ে দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত কাজ করছে:

  • ক্রিয়েটিভ সিটিস নেটওয়ার্ক (UCCN): ইউনেস্কো ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫৬টি শহরকে ‘গ্যাস্ট্রোনমির সৃজনশীল শহর’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা স্থানীয় খাদ্য ঐতিহ্য ও স্থায়িত্ব রক্ষা করে।

  • পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার: রেস্তোরাঁ ও রন্ধনশিল্পে কয়লার পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাস বা বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে ইউনেস্কো।

  • সবুজ সংস্কৃতির খাদ্যাভ্যাস (Green Culture Diets): এফএও (FAO) উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার ও কম ক্ষতিকর রান্নার পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে “আমাদের মনে মাছ, তোমার প্লেটে মাছ”-এর মতো রান্নার বই প্রকাশ করেছে।

  • গ্রামীণ নারী ও ঐতিহ্য রক্ষা: আফ্রিকার বিভিন্ন ডাল ও লেবাননের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মতো কম পরিচিত পুষ্টিকর উপাদান চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন করা হচ্ছে।

আজকের দিনের অঙ্গীকার: সুস্থ মানুষ, শান্তিময় পৃথিবী

১৮ জুন আন্তর্জাতিক দিবস-এর এই দ্বৈত উদযাপন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য যেমন মনের সুস্থতা ও সামাজিক শান্তি প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন শরীরের সুস্থতা ও একটি রোগমুক্ত সবুজ পৃথিবী। আসুন, আজকের এই দিনে আমরা একদিকে যেমন যেকোনো ধরণের সামাজিক বৈষম্য ও ঘৃণা বক্তব্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রতিজ্ঞা করি; ঠিক একইভাবে নিজের অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা, খাদ্য অপচয় রোধ এবং আমাদের মাতৃভূমিকে সুরক্ষিত রাখতে ছোট ছোট পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করি।

সর্বশেষ নিউজ