হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররমের দশম দিবস অর্থাৎ ‘পবিত্র আশুরা’ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। বিশ্ব সৃষ্টির আদি ইতিহাস থেকে শুরু করে ইসলামের সবচেয়ে বিয়োগান্তক অধ্যায়—সবকিছুরই অবতারণা হয়েছে এই ১০ মহররম। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আগামী শুক্রবার (২৬ জুন) ঢাকা মহানগরীতে শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিলের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একগুচ্ছ কড়া নির্দেশনা ও ট্রাফিক ডাইভারশন জারি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
আশুরার সৃষ্টিতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক মহিমা
ইসলামি ইতিহাস ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই ১০ মহররম তথা আশুরা দিবসে সংঘটিত হয়েছে। আদি মানব হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, বেহেশত-দোজখ, আকাশ-পৃথিবী, চাঁদ-সূর্য, বায়ু ও পানির মতো মৌলিক উপাদান সবই এই পবিত্র দিবসে সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন নবীদের যুগে অলৌকিক মুক্তির ঘটনার সাক্ষীও এই আশুরা:
-
নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অলৌকিক মুক্তিলাভ।
-
ফেরাউনের কবল থেকে হজরত মুসা (আ.)-এর নীল নদ পাড়ি দিয়ে সদলবলে মুক্তি।
-
মহাপ্লাবনের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে হজরত নুহ (আ.)-সহ ঈমানদারদের রক্ষা পাওয়া।
-
দীর্ঘ পরীক্ষা শেষে মাছের উদর থেকে হজরত ইউনুস (আ.)-এর মুক্তি।
-
হজরত ঈসা (আ.)-কে সশরীরে আকাশে উত্তোলন।
সর্বশেষ, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইরশাদ অনুযায়ী—ভবিষ্যতে এই ১০ মহররমের আশুরার দিনেই মহাবিশ্বের মহাপ্রলয় বা কিয়ামত সংঘটিত হবে।
আপসহীন সংগ্রাম: কারবালা ও ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদাত
আশুরার ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্তক ও মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ৬১ হিজরির ১০ মহররম, ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালার প্রান্তরে। মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদরের দুলাল, শেরে খোদা হজরত আলী (রা.) ও খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুজ্জোহরা (রা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইমাম হোসাইন (রা.) স্বৈরাচারী ও জালিম শাসক ইয়াজিদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করতে গিয়ে সপরিবারে শাহাদাতবরণ করেন।
💡 সংগ্রামের মূল কথা: ইমাম হোসাইন (রা.)-এর এই আন্দোলন কোনো কাফের শাসকের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং ইসলামের লেবেল গায়ে জড়িয়ে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড ও রাজতন্ত্রকে জায়েজ করতে চাওয়া নামধারী মুসলিম শাসক ইয়াজিদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছিল। এটি ছিল মানবতার মুক্তির জন্য এক মহান মুক্তিযুদ্ধ।
৬০ হিজরিতে আমিরে মুয়াবিয়ার ইন্তেকালের পর তার অযোগ্য ও পথভ্রষ্ট পুত্র ইয়াজিদ অবৈধভাবে মদিনার শাসনভার নিয়ে ইমাম হোসাইনের ওপর আনুগত্যের (বাইআত) জন্য চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু অসত্যের কাছে মাথা নত না করা ইমাম হোসাইন (রা.) মদিনা ছেড়ে কুফাবাসীর আমন্ত্রণে সেখানে রওনা হন। কিন্তু পথিমধ্যে গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের সৈন্যরা কারবালার প্রান্তরে তাকে অবরুদ্ধ করে। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও তিনি প্রামাণ করে গেছেন যে, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানবতাবাদীদের গর্জে উঠতে হয়। অবশেষে সিনান ইবনে আনাস বা আমর ইবনে জিলসাওসানের মতো নির্মম ঘাতকদের হাতে তিনি সপরিবারে শহীদ হন।
ইতিহাসের শিক্ষা: ঘাতকদের নির্মম পরিণতি
কারবালার নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডির পর ঘাতকেরা সাময়িকভাবে উল্লাস করলেও আল্লাহর অলঙ্ঘনীয় বিধানে তাদের পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর নির্মম মৃত্যুর পর মক্কা, মদিনা ও কুফায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।
বিপ্লবী নেতা মুখতারের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা কুফার ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে কারবালার যুদ্ধাপরাধীদের নিধন শুরু করে। এই অভিযানে কুখ্যাত ঘাতক সীমারসহ ২৮৪ জন ঘাতক তরবারির আঘাতে প্রাণ হারায়। একপর্যায়ে জাবের তীরে যুদ্ধের সময় কুফার অত্যাচারী গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ এক সাধারণ সৈনিকের বর্শাঘাতে বুক বিদীর্ণ হয়ে চরম অপমানজনক মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
২৬ জুনের তাজিয়া মিছিল: ডিএমপির একগুচ্ছ কড়া নির্দেশনা
পবিত্র আশুরা (১০ মহররম) উপলক্ষে ২৬ জুন ঢাকা মহানগরীতে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল যেন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হতে পারে, সেজন্য ডিএমপি কমিশনার বিশেষ নিরাপত্তা নির্দেশনাবলী জারি করেছেন।
ডিএমপি ঘোষিত মূল নিরাপত্তামূলক নির্দেশনাসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
-
নিশানের উচ্চতা: মিছিলে ব্যবহৃত ধর্মীয় নিশানের উচ্চতা কোনোভাবেই ১২ ফুটের বেশি হতে পারবে না।
-
অস্ত্র ও ধাতব বস্তু নিষিদ্ধ: মিছিলে কোনো প্রকার ধারালো ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, ছোরা, তরবারি, বর্শা বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
-
লাগেজ ও সন্দেহজনক বস্তু: মিছিলে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিরা সাথে কোনো ব্যাগ, পোটলা, সুটকেস, ছাতা বা কুকার জাতীয় সন্দেহজনক প্যাকেট নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না।
-
শব্দ দূষণ রোধ: উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী কোনো যন্ত্র, পিএ সিস্টেম বা ঢাক-ঢোল বাজানো যাবে না।
-
পটকা ও আতশবাজি নিষিদ্ধ: ধর্মীয় গাম্ভীর্য বজায় রাখতে সব ধরনের আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

