দেশ ভূরাজনীতি ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদে

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক উপযোগিতা, পানির ন্যায্য হিস্যা, অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান এবং জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বৃহস্পতিবার এনটিভির জনপ্রিয় নীতি-নির্ধারণী টকশো ‘সংলাপ প্রতিদিন’-এ অংশ নিয়ে আলোচকরা সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও ভূরাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ না করে বড় অঙ্কের ঋণের মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ করা হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

জাতীয় সংসদে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্প্রতি দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর সাহসী বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন দৈনিক ‘এইদিন এই সময়’ পত্রিকার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক আহমেদ করিম। তিনি বলেন, তিস্তা নদীর পানি ও নাব্যতা রক্ষার সাথে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রায় এক-দশমাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। তবে এই প্রকল্প নিয়ে গত এক দশক ধরে এক ধরনের আন্তর্জাতিক টানাপড়েন চলছে।

২০১৬ সালে চীনের সাথে সমঝোতা স্মারক সই হলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। ভারত নিজে এখানে বড় বিনিয়োগ করছে না, আবার চীনের অর্থায়নে তাদের ঘোর আপত্তি রয়েছে। তবে জনগণের স্বার্থে যে কোনো দেশের অর্থায়নে বা নিজস্ব উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

অনুষ্ঠানের অপর আলোচক, ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং জনতা দলের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ( অবঃ) শামীম কামাল তিস্তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতায় উত্তরবঙ্গের কৃষিকে বাঁচাতে ডালিয়াতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে ১৯৮৭ সালে ভারত গজলডোবায় একতরফা বাঁধ নির্মাণ করার পর থেকে বাংলাদেশের অববাহিকায় বিপর্যয় শুরু হয়। পূর্বে যেখানে শুষ্ক মৌসুমেও ৬ হাজার কিউসেক পানি পাওয়া যেত, তা বর্তমানে মাত্র ৩০০ কিউসেকে নেমে এসেছে। অপরদিকে বর্ষাকালে ভারত একযোগে ৪ লক্ষ কিউসেক পর্যন্ত পানি ছেড়ে দেয়, যার ফলে প্রতি বছর উত্তরবঙ্গের ১১৬ কিলোমিটার অববাহিকায় ব্যাপক নদীভাঙন ও জানমালের ক্ষতি হচ্ছে।

পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ২০২৩ সালের চূড়ান্ত সমীক্ষা অনুযায়ী, ১২ হাজার কোটি টাকার এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে ৭ থেকে ১০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে, আধুনিক স্যাটেলাইট সিটি গড়ে উঠবে এবং এটি চীনের গুয়াংজুর মতো একটি উন্নত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। তবে এই প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা দিল্লির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম টানাপড়েন তৈরি করবে, যা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে বলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামাল মন্তব্য করেন।

সরকার কর্তৃক সদ্য অনুমোদিত রাজবাড়ীর পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটির তীব্র সমালোচনা করে ব্রিগেডিয়ার শামীম কামাল এটিকে একটি ‘ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণার সূত্র দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে একটি বদ্বীপ (ডেল্টা), যার প্রাণ হলো পলি। উজানে ভারতের প্রায় ৩০০টি ছোট-বড় বাঁধের কারণে নদীগুলোর পলি প্রবাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এখন যদি রাজবাড়ীতে আরেকটি বড় ব্যারেজ দেওয়া হয়, তবে অবশিষ্ট পলিও সেখানে আটকে যাবে। এর ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হবে এবং পানির গতি তীব্র হয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মোহনা ভাঙতে ভাঙতে সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, এই ব্যারেজের কারণে ইলিশসহ বহু মিঠাপানির সুস্বাদু মাছের অবাধ প্রজনন ও চলাচল চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। যেখানে কম খরচে ও ঝুঁকিহীনভাবে তিস্তা প্রকল্প করা যাচ্ছে না, সেখানে কোনো গণ-আলোচনা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাধীন পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই কেন পদ্মা ব্যারেজের মতো মেগা প্রজেক্টে অর্থ অপচয় করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

সাংবাদিক আহমেদ করিম ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে মরে যাওয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫টি নদীকে সচল করতে এবং ৭ কোটি মানুষের পানির নিরাপত্তা দিতে পদ্মা ব্যারেজের মতো প্রকল্প অপরিহার্য, তবে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

মোংলা ও পায়রা বন্দর এবং থার্ড টার্মিনাল প্রসঙ্গে আলোচকদ্বয় মেগা প্রকল্পের নামে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। ব্রিগেডিয়ার শামীম কামাল অভিযোগ করেন, পায়রা বন্দরে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের নামে বেলজিয়ামের একটি কোম্পানিকে ৬ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ড্রেজিংয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় ১০.৫ মিটার গভীরতার নদী পুনরায় পলি জমে ৫.৫ মিটারে নেমে আসে, যার ফলে কোনো মাদার ভেসেল সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না।

আলোচকরা বলেন, অনেক প্রকল্প দেশের অর্থনীতির প্রয়োজনে নয়, বরং কতিপয় সুবিধাভোগী অলিগার্ক ও লবিস্টদের পকেট ভারী করার জন্য তাড়াহুড়ো করে পাস করা হয়। বিগত সরকারের আমলের মেগা প্রজেক্টের মেগা ঋণ এবং মেগা চুরির কারণেই দেশের ডলার সংকট তীব্র রূপ নিয়েছিল, যার খেসারত আজ সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে।

দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ১০০টি নতুন কূপ খননের সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আহমেদ করিম বলেন, এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। এতদিন নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান না করে কেবল আমদানিকৃত এলপিজির ব্যবসায়িক কমিশন খাওয়ার জন্য একটি বিশেষ মহল ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়কে ব্যবহার করেছে। ভোলায় ১৯৯৫ সালে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার পরেও তা জাতীয় গ্রিডে না এনে আমদানি নির্ভরতাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।

ব্রিডিয়ার শামীম কামাল গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ২০১২ সালে মায়ানমার ও ভারতের সাথে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে আমরা প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা জয় করেছি। কিন্তু গত ১৪ বছরে ব্লু-ইকোনমি নিয়ে কেবল বড় বড় সেমিনার-সিম্পোজিয়ামই হয়েছে, সমুদ্র থেকে এক টাকার গ্যাস বা খনিজ সম্পদও উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। অথচ আমাদের পাশেই মায়ানমার গভীর সমুদ্র থেকে অবিরাম গ্যাস তুলে পাইপলাইনের মাধ্যমে ২২০০ কিলোমিটার দূরে চীনে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ যদি দ্রুত অফশোর গ্যাস উত্তোলন করতে না পারে, তবে আদানির মতো বিদেশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির ওপর চিরতরে পরাধীন হয়ে পড়তে হবে।

আলোচনার শেষভাগে জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। আহমেদ করিম বলেন, জুলাই বিপ্লবের মূল স্তম্ভ ছিল গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং স্বৈরাচার ও দুর্নীতির অবসান। কিন্তু বর্তমান সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল কাউকেই জুলাইয়ের এই মূল চেতনা ধারণ করতে দেখা যাচ্ছে না। তারা কেবল ক্ষমতা ধরে রাখা এবং সময় পার করার রাজনীতিতে লিপ্ত।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাজনৈতিকদলগুলো যদি মনে করে তরুণ সমাজ বা জেন-জি ঘুমিয়ে গেছে, তবে তারা চরম ভুল করছে। দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে, এবার জেন-জি’র সাথে স্কুলের ‘আলফা প্রজন্ম’ যুক্ত হয়ে সংসদ ভবন ও বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের মতো আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলবে।

জনতা দলের প্রধান শামীম কামালও সুর মিলিয়ে বলেন, জুলাই বিপ্লবের মূল সংস্কারগুলো বাদ দিয়ে পুরোনো কায়দায় ঢালাও মামলা-বাণিজ্য ও ক্ষমতা ভাগাভাগির রাজনীতি সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।

সর্বশেষ নিউজ