ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, ফুটবল যে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জাতির মুখেও হাসি ফোটাতে পারে—তার অনন্য এক নজির দেখল বিশ্ববাসী। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে মিশর। তবে এই ঐতিহাসিক ফুটবলীয় অর্জনের পর পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে মিশরের কোচ হোসাম হাসানের একটি আবেগঘন ঘোষণা। তিনি এই মহাকাব্যিক জয় উৎসর্গ করেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের মজলুম জনগণের উদ্দেশ্যে।
আর এই বার্তার পর বোমায় বিধ্বস্ত গাজার তাঁবু ও ধ্বংসাবশেষ থেকে বেরিয়ে এসে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে উঠেছেন হাজারো ফিলিস্তিনি।
টাইব্রেকার নাটকে মিশরের প্রথম নকআউট জয়
শুক্রবার (৩ জুলাই ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ বত্রিশের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মিশর ও অস্ট্রেলিয়া। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচটি ১-১ সমতায় ছিল।
-
ম্যাচের ১৩ মিনিটেই ইমাম আশুরের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যায় মিশর।
-
তবে ম্যাচের ৫৫ মিনিটে মোহাম্মদ হানির আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া।
পরবর্তীতে পেনাল্টি শুটআউটে গড়ায় ম্যাচ। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার হ্যারি সাউতার ও লুকাস হেরিংটন স্পটকিক মিস করলে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র টিকিট কাটে আফ্রিকার দেশটি। জয়সূচক শেষ কিকটি নেন হোসাম আবদেলমাগুইদ, আর তাতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম।
ম্যাচ ফ্যাক্টস ও টাইব্রেকার শিট
| ম্যাচের প্যারামিটার (Match Stats) | মিশর (Egypt) | অস্ট্রেলিয়া (Australia) |
| নির্ধারিত সময় (৯০+ মিনিট) | ১ (ইমাম আশুর ১৩’) | ১ (মোহাম্মদ হানি আত্মঘাতী ৫৫’) |
| টাইব্রেকার ফলাফল | ৪ (বিজয়ী) | ২ |
| পেনাল্টি মিস | ০ | ২ (সাউতার ও হেরিংটন) |
| ঐতিহাসিক অর্জন | ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ ১৬ | শেষ বত্রিশ থেকেই বিদায় |
মাঠেই সেজদা ও ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে কোচ
ম্যাচ শেষ হতেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় ডালাস স্টেডিয়ামে। মিশরের খেলোয়াড়রা মাঠেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। অন্যদিকে, মিশরের কোচ হোসাম হাসান নিজের দেশের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত কোচ বলেন,
“আল্লাহ ফিলিস্তিনিদের চূড়ান্ত বিজয় দান করুন এবং তাদের শহীদদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। এই ঐতিহাসিক জয় আমি মিশরের সাধারণ জনগণ এবং ফিলিস্তিনের সেই সম্মানিত, বীর মানুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি।”
💡 গাজা থেকে এক্স (টুইটার) বার্তা: "জীবনে এই প্রথম এতটা উত্তেজনা নিয়ে বিশ্বকাপ দেখছি। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি আর তাঁবু থেকে হাজারো মানুষ বেরিয়ে এসে একসঙ্গে ম্যাচ দেখছিল। চারদিকে শুধু হাসি আর উল্লাস।" — তামের নাভেদ (গাজার বাসিন্দা)।
যুদ্ধের তীব্রতার মাঝেও এক চিলতে স্বস্তি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, গাজার বোমায় ধুলিসাৎ হওয়া ভবনের পাশেই খাটিয়া ও অস্থায়ী বড় পর্দায় জেনারেটর চালিয়ে খেলা দেখছেন শত শত ফিলিস্তিনি। অনেক শিশুর মুখে আঁকা ছিল মিশরের ট্রাইকালার পতাকা। মিশরের জয়ের সাথে সাথেই উল্লাসে মেতে ওঠে গাজার অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরগুলো। যুদ্ধের ভয়ংকর বিভীষিকার মাঝে ফুটবল যেন তাদের উপহার দিল এক চিলতে মহামূল্যবান আনন্দ।

