বিগত ১৭ বছর ধরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে কোনো বড় ধরণের অনিয়ম, জালিয়াতি বা মেগা দুর্নীতি হয়েছে কিনা, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সম্প্রতি এক জরুরি অফিস আদেশের মাধ্যমে এই কমিটি গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসন আমলের দীর্ঘ সময়কালসহ পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক লেনদেনও এই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ সময় তিনি বিগত বছরগুলোতে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় হওয়া দুর্নীতির কিছু ভয়াবহ ও লোমহর্ষক চিত্র গণমাধ্যমের সামনে উন্মোচন করেন।
কাজ না করেই পিরোজপুরে ৬ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন!
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, বিগত ১৭ বছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থায় নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “শুধু পিরোজপুর জেলাতেই এলজিআরডি (LGRD)-এর অধীনে ২ হাজার ৪৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এর মধ্যে ১ হাজার ৬১০টি প্রকল্পে বাস্তবে কোনো কাজই করা হয়নি! স্রেফ কাগজ-কলমে টেন্ডারের ফর্মালিটি মেইনটেইন করে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করে লুটে নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, এই মেগা হরিলুটের সঙ্গে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ছাড়াও এলজিআরডির নির্বাহী প্রকৌশলী, হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা কমিশনের তৎকালীন সচিবসহ সরকারের একটি বড় সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত ছিল। এই বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত শেষে ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা করা হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। তবে তদন্তের কারণে গত দেড় বছর ধরে পিরোজপুরে সব ধরণের উন্নয়নকাজ বন্ধ থাকায় জেলাটির তিনজন এমপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুদকের আওতার বাইরের প্রকল্পগুলো চালুর আবেদন জানিয়েছেন। ঈদের পর পিরোজপুর সরজমিনে পরিদর্শন শেষে স্থগিত কাজগুলো পুনরায় শুরু করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
কমিটির সদস্যবৃন্দ ও অনুসন্ধানের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা
মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগের মহাপরিচালককে এই বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে এবং কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা-১ অধিশাখা) মো. সামছুল ইসলামকে।
কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন—স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (জেলা পরিষদ শাখা) খোন্দকার ফরহাদ আহমদ, উপসচিব (সিটি করপোরেশন-১) মো. রবিউল ইসলাম, সিনিয়র সহকারী সচিব (পাস-৩) মোছা. আকতারুন নেছা, সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন-১) তাহমিনা আক্তার এবং সিনিয়র সহকারী সচিব (উন্নয়ন-২) এ বি এম আরিফুল ইসলাম।
অফিস আদেশে কমিটির কার্যপরিধি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নবগঠিত এই টিমকে জানুয়ারি, ২০০৯ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কালের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং এর আওতাধীন ওয়াসা, এলজিইডি, ডিপিএইচইসহ সমস্ত দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি তথ্যসমৃদ্ধ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমিটিকে তথ্য-প্রমাণের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও প্রয়োজনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত (কো-অপ্ট) করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
সচিবের সই ছাড়া ফাইল পাস: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে রুলস অব বিজনেস ভঙ্গের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের কিছু প্রশাসনিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের কোনো প্রকার স্বাক্ষর বা মতামত ছাড়াই জোর করে ফাইল নিয়েছিলেন এবং নিজেই সরাসরি স্বাক্ষর করে তা অনুমোদন দিয়েছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে ‘রুলস অব বিজনেস’ (Rules of Business)-এর পরিপন্থী।”
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, দেশের প্রচলিত প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের সই ছাড়া কোনো মন্ত্রী বা উপদেষ্টা সরাসরি একক সিদ্ধান্তে ফাইল অনুমোদন দিতে পারেন না। তবে নবগঠিত এই ৭ সদস্যের কমিটির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এই রুলস অব বিজনেস ভঙ্গের বিষয়টি সহ বিগত ১৭ বছরের সমস্ত অন্ধকার অধ্যায়ের বিস্তারিত তথ্য দেশের মানুষের সামনে বেরিয়ে আসবে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

