১৬ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার

ক্ষুদ্রঋণে অব্যবস্থাপনা: মরণফাঁদে প্রান্তিক মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে যে ক্ষুদ্রঋণ একসময় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের কাছে তা এখন ক্রমেই আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। একটু স্বচ্ছল জীবনের আশায় নেওয়া এই ঋণ অনেকের জীবনে আজ ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। কিস্তির টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন মানুষ, কেউ হারাচ্ছেন ভিটেমাটি, কেউ আবার জীবনই বেছে নিচ্ছেন বিসর্জনের পথ।

গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী—যাঁদের ব্যাংক গ্যারান্টি নেই—তাঁদের দোরগোড়ায় সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দেয় বিভিন্ন এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। হাঁস-মুরগি পালন, গাভী কেনা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার স্বপ্ন নিয়ে নেওয়া এসব ঋণের সুদের হার অনেক ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সাপ্তাহিক কিস্তির কঠোর চাপ, যা অল্প সময়েই সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে রূপ দেয়।

বাস্তব চিত্র বলছে, একবার ঋণের কিস্তির চক্রে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটি প্রতিষ্ঠানের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে মানুষ বাধ্য হচ্ছে আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ঋণ নিতে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণগ্রহীতা একাধিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঋণের জালে আটকে পড়েছেন। এই ‘ঋণের ওপর ঋণ’ নেওয়ার প্রবণতাই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

কিস্তি আদায়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত চাপ, হুমকি এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অপমানের আশঙ্কায় বহু মানুষ নিজ গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছেন। রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পবা, মোহনপুর ও তানোর উপজেলার গ্রামগুলোতে এই সংকটের চিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মাত্র পাঁচ মাসে ঋণের চাপে আটজনের অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কৃষক, অটোরিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ আত্মহত্যার আগে চিরকুটে লিখে গেছেন—‘সুদ দিয়ো না, কিস্তি দিয়ো না।’ এই আর্তনাদ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত না হয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগব্যাধি কিংবা বাজারদরের পতনের মতো পরিস্থিতিতে কিস্তি মওকুফ বা পুনঃতফসিলের সুযোগ না থাকায় ঋণগ্রহীতারা আরও গভীর সংকটে পড়েন। পিকেএসএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানও অতীতে ক্ষুদ্রঋণকে দরিদ্রদের জন্য ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল রয়েছে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায়। তথাকথিত ‘টার্গেট’ পূরণের চাপে মাঠকর্মীরা গ্রাহকের প্রকৃত ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই না করেই ঋণ বিতরণ করছেন। একজন ব্যক্তি আগে কয়টি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন—তা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) মতো একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় এই বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ছে। এনজিও কর্মকর্তাদের তাড়াহুড়া আর গ্রাহকদের তথ্য গোপনের সুযোগে তৈরি হচ্ছে এক আত্মঘাতী ঋণচক্র।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কৃষকেরা যখন ফসল উৎপাদনের জন্য ঋণ নেন, তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারমূল্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। পেঁয়াজ বা পানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পরও কিস্তির চাপ কমে না। রাষ্ট্র বা ঋণদাতা সংস্থার পক্ষ থেকে তখন কার্যকর কোনো আইনি বা সামাজিক সুরক্ষা মিলছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সময় এসেছে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুনর্বিন্যাস করার। শুধু মুনাফা বা লক্ষ্য পূরণ নয়, বরং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জীবনমান ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অবিলম্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ঋণের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু, দুর্যোগকবলিত ও লোকসানে থাকা কৃষকদের জন্য কিস্তি আদায়ে নমনীয়তা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি। ঋণের চাপে পড়ে আর কোনো প্রাণ ঝরে পড়ুক—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সর্বশেষ নিউজ