৪ মে ২০২৬, সোমবার

রাজনৈতিক বিভাজন সম্ভব আত্মিক বিভাজন নয়

ফকির শওকত
spot_img
spot_img

রাজনৈতিক বিভাজন সম্ভব, আত্মিক বিভাজন নয় সাত দশকের পথচলা- যাপনে গৃহী, চিন্তায় ফকিরি বা ফেরারি। আপাতত শেখ মোহাম্মদ সুলতানে ক্ষণিক থামা। হাজার বছর ধরে জীবনানন্দ পথ চলে থেমেছিলেন নাটোরে। তাকে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। আমাকে কোনো মানবিক নারী থামায়নি; থামিয়েছে এস এম সুলতানের পরীরা, যারা ‘ফার্স্ট প্লান্টেশন’-এর চারা গাছটিতে পানি দিচ্ছে। মানবসভ্যতার কোনো অথেনটিক ইতিহাস হয় না। এটি মূলত গল্পের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। পৃথিবীর কৃষি সভ্যতা কোথা থেকে শুরু, তা নিয়ে যার যার মতো ইতিহাসচর্চা আছে। ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি মতে হজরত আদম প্রথম মানুষ। কিন্তু তিনি কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন কি না— ধর্মগ্রন্থে তা সুনির্দিষ্ট নয়। তাই এস এম সুলতান ছবি আঁকলেন, নাম দিলেন ‘ফার্স্ট প্লান্টেশন’। পটভূমি বাংলা। তিনি কোনো দাবি করেননি। কিন্তু গাঙেয় বদ্বীপের একজন গৃহী হিসেবে আমি সেই দাবি করতেই পারি। সুলতানের ফার্স্ট প্লান্টেশনের চুলদাড়িওয়ালা হৃষ্টপুষ্ট মানুষটি আদমেরই প্রতিকৃতি- যিনি এই বদ্বীপে চারা রোপণ করে প্রথম কৃষি সভ্যতার সূচনা করেন। পরীরা আসমান থেকে পানি ছিটিয়ে তাকে স্বর্গীয় রূপ দিচ্ছে। এভাবেই বলা যায়, শরীরী মানুষের কল্পনায় জিন-পরী, দেবদেবীর চরিত্র এঁকে যে গল্প তৈরি হয়েছে, সেটিই সভ্যতা। এই বদ্বীপে যারা এসেছেন, তাদের গল্পেও স্বর্গ-মর্ত্য, দুনিয়া, বেহেশত, নরক, দোজখ, নির্বাণ- সবই আছে। এখানে রাজ্য আছে, রাজপুত্র-রাজকন্যার প্রেম আছে, গল্প আছে। রাজ্যজয় আছে, ক্ষয় আছে। কিন্তু ইতিহাসের দলিল-দস্তাবেজ কীর্তিনাশায় বা হিমালয়বাহিত পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তবে আমাদের চাঁদ সওদাগর, গাজী-কালু-চম্পাবতী, বনবিবি, দক্ষিণ রায়, ফকির মজনু শাহ, ভবানী পাঠক- গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা ফকির, পীর-দরবেশদের গল্পই আমাদের সভ্যতা। আরব-পারস্য, তুর্কি-আফগান, মোঘলহুন, পাঠান-রাজপুত সবাই বাংলার পলিপানিতে ধুয়ে বাঙালি হয়ে গেছে। সবার গল্পই আমাদের গল্প। রাম-রাবণ, রামায়ণ-মহাভারত, ইউসুফ-জুলেখা, আরব্য রজনী- সবকিছুরই আমরা ওয়ারিশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন, নজরুল, জীবনানন্দ, সুলতান- তাদের সৃষ্টিকর্মই আমাদের পরিচয়। বাংলা বা বাঙালি নামকরণ নিয়ে নানা মত আছে। বাংলা খাড়ি, বে অব বেঙ্গল, কিংবা বঙ্গদেবতা বঙ্গের সঙ্গে ‘আল’- সব যুক্তিই আলোচ্য। ব্যবসা, কৃষি ও কুটিরশিল্পে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে টেনে এনেছে। কেউ ফিরে গেছে, কেউ ফেরেনি। যারা রয়ে গেছে, তারাই ভাষা ও সভ্যতা নির্মাণে অবদান রেখেছে। কোরআন-বাইবেল, বেদ-ত্রিপিটক- দুনিয়ার সব ধর্মগ্রন্থ এখানে যেমন : জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি এখানকার লৌকিক বিশ্বাস ও আচার তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। তাই এখানকার ইসলাম, হিন্দুত্ব ও সহজিয়া মতো পৃথিবীর অন্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। সম্ভবত বাংলাই সেই জনপদ, যেখানে হাজার বছর ধরে বড় দাগে হিন্দুমুসলমান সমানুপাতিক হারে বসবাস করে এসেছে। রাজনৈতিক বিভাজন না হলে হয়তো এখনও তাই থাকত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে যারা বিতর্ক তোলেন, কিংবা যদি কোনো জুলাই সনদ বাঙালিত্বকে অস্বীকার করে, তাতে বাঙালির হাজার বছরের পথচলা থেমে যাবে না। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির রাজনৈতিক বিজয়ের পর বাঙালি জাতির রক্তধারায় যে মিশ্রণ ঘটেছে, তা তাকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। পাঠান, মোঘল ও ইংরেজ শাসনামলে সেই রূপ আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। আজ বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, বিহার ও উড়িষ্যায় বাঙালির বসবাস। পৃথিবীর আরও নানা দেশে জীবিকার সংগ্রামে লিপ্ত সবাই বাঙালি। বাংলাদেশ তাদের স্বপ্নের প্রথম আধুনিক স্বাধীন রাষ্ট্র, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যার জন্ম। বাহাত্তরের সংবিধানের চার স্তম্ভের একটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যেখানে অন্য জাতিকে অস্বীকার করা হয়নি। পৃথিবীর চল্লিশ কোটি বাঙালির গর্ব এই স্বাধীন বাংলাদেশ। সব জাতি ও ধর্মের মানুষ যেমন : এখানে ছিল, তেমনি থাকবে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সংযোজিত হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে বাঙালির হাজার বছরের পথচলাকে অস্বীকার করা হয়েছে বা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিভাজন সম্ভব, কিন্তু বাঙালির আÍিক বিভাজন সম্ভব নয়। দ্বিজাতিতত্ত্বে নতুন রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু নতুন জাতি সৃষ্টি করা যায় না। ১৯৭১ সালে লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়ে সেই সত্যই প্রমাণ করেছে।

সর্বশেষ নিউজ