১১ মে ২০২৬, সোমবার

গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ অবৈধ ও অসাংবিধানিক: হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করে অনাগত সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন উচ্চ আদালত। মায়ের গর্ভে থাকা গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করাকে অসাংবিধানিক, অনৈতিক এবং নারীর প্রতি চরম বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করে আজ সোমবার (১১ মে ২০২৬) হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন।

লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ কেন অসাংবিধানিক? আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট তাঁদের পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, অনাগত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ এবং তা মা-বাবা বা স্বজনদের কাছে প্রকাশ করা কেবল একটি অনৈতিক চর্চাই নয়, এটি নারীর মর্যাদা ও জীবনের অধিকারের পরিপন্থী। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, এই ধরণের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতার চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কোনো জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় এই কুপ্রথাটি জেঁকে বসেছিল।

কন্যাশিশু হত্যা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা

রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে কন্যাশিশু হত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক লিঙ্গীয় ভারসাম্য নষ্ট করে। আমাদের সমাজে কন্যা ভ্রূণ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের পথ প্রশস্ত করে এই তথ্য প্রকাশ। তাই অনাগত শিশুর জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে এই তথ্য গোপন রাখা বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন আদালত।

সংবিধানের ৫টি অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক এই চর্চা

আদালত তাঁদের পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরণের তথ্য প্রকাশ বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সংবিধান নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও সাম্যের যে অধিকার দিয়েছে, লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশের মাধ্যমে তার ব্যত্যয় ঘটে। আদালত আরও বলেন, রাষ্ট্র শুধু গাইডলাইন প্রণয়ন করেই দায় এড়াতে পারে না; বরং এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

রিট আবেদন ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট

২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেছিলেন যে, লিঙ্গ পরিচয় জানার ফলে মা ও শিশুর মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন এবং আজ তার বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হলো।

চিকিৎসকদের জন্য নতুন গাইডলাইন ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আদালতের এই রায়ের ফলে এখন থেকে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা কোনো চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা অন্য কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করতে পারবেন না। আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “এটি নারীদের জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয়। এখন রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এই রায়ের লঙ্ঘন না হয়।” রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান নিজেই এবং তাকে সহযোগিতা করেন তানজিলা রহমান।

সর্বশেষ নিউজ