বর্তমান পৃথিবী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, পরিবেশ বিপর্যয়, একের পর এক যুদ্ধ এবং লাগামহীন সামরিক বাজেটের মতো সংকটে জর্জরিত। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিকতার চরম অবমাননা, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, গণতান্ত্রিক শাসনের দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে আশা ও ভীতি জাগানো প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের। এই চরম নৈরাজ্যের মধ্যেও, আশায় বুক বেঁধে আছে পৃথিবীর মানুষ।
তবে আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু থমকে গেছে মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে এক বিশাল পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, তথাকথিত উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে, একক আধিপত্যবাদী পরাশক্তি এবং অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে বহুপাক্ষিকবাদে বিশ্বাসী এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী। এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে ইরান যুদ্ধ। অনেক দেশের কূটনীতিকদের মতে ইরানে পরিচালিত অত্যন্ত অজনপ্রিয় এবং অবৈধ যুদ্ধটি একতরফা আধিপত্যবাদের কারণে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এই সংঘাত স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিশ্বকে আর কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে বা একমুখী মেরূকরণে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা নীতি এবং আইন অমান্য করে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্ধকার যুগটি এখন দ্রুত সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্য দিয়ে যেন যুক্তরাষ্ট্রের এই একক আধিপত্যের পতন ঘটছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে, পশ্চিমা অন্য দেশগুলো নতুন করে নিজেদের অবস্থান সাজিয়ে নিচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে, নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকার দিন শেষ। পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা বলয় কতটা ভঙ্গুর ছিল, তা এখন সবার সামনে স্পষ্ট।
ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা নীতি ইউরোপের স্বার্থরক্ষায় তেমন কোনো কাজে আসেনি। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, বিশ্বের অনেক দেশ এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির পেছনে না ছুটে বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চলছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ‘বিপর্যয়কর’ ভুল বলে কড়া সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই.স্টিগলিটজ। স্টিগলিটজের মতে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এর প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল ইতিমধ্যে ব্যাহত হয়েছে এবং তেল-গ্যাস উৎপাদন স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। অধিকাংশ হিসাব অনুযায়ী, এসব ক্ষতি সারাতে কয়েক বছর সময় লাগবে। কারণ ট্রাম্পের শুল্কনীতির পর এবার যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ব আগে থেকেই ক্রয়ক্ষমতা সংকটে ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ফলে এর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াবে। এর ফলে কভিড-১৯ পরবর্তী সময় বিশ্বঅর্থনীতির যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট তীব্র হবে এবং আবাসন ও ঋণ পরিস্থিতি খারাপ হবে। একই সময়ে ধনকুবের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রাম্পের করছাড় কার্যকর থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে, ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুযোগ সীমিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিট তেল রপ্তানিকারক হওয়ায় লাভবান হবে ট্রাম্পের এ দাবি অর্থহীন।
এক্সনের মতো কোম্পানি লাভবান হতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে। এর মানে সাধারণ মার্কিন নাগরিককে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হবে, আর বড় তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করবে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ খুব কম বলে মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্বসূরিরা যে শান্তিপূর্ণ ও সীমান্তহীন বিশ্ব গড়তে চেয়েছিলেন, তার কফিনে আরও একটি পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে। যে দেশ এ ব্যবস্থার ভিত্তি গড়েছিল, ট্রাম্পের অধীনে এখন সেই দেশ তা ভেঙে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতি বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। এর আগে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য কয়েক দফা আলোচনা, পুনরালোচনা অসমাপ্ত রেখেই নতুন করে ইরানে হামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ৪০ দিন যুদ্ধের পর আবারও যুদ্ধবিরতি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা করছে মার্কিন প্রশাসন এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কী অর্জন করতে চাচ্ছে, তা খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এই ৪০ দিনের যুদ্ধ শুরুর সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। যুদ্ধের মাঝপথে যখন দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির তুলনায় যথেষ্ট দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইরান তাদের লড়াকু মনোভাব, যুদ্ধকৌশল এবং সুসমন্বয়ের মধ্য দিয়ে পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ থেকে তখন শোনা গেল, তারা ইরানের আকাশ ও নৌ-সক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলেছেন এবং আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডারদের হত্যার মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনে তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এ ধরনের কথার মধ্য দিয়ে কার্যত একজন পরাজিত মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের দিকটিই ফুটে ওঠে। অবশ্য এই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, বিরতিতে রয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় এর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করার মতো অবস্থাও সৃষ্টি হয়নি। তবে ট্রাম্পের অস্থিরতা, মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, অন্যায়ভাবে হুমকির পর হুমকি এবং আলোচনার মাঝপথে শর্ত বেঁধে দেওয়া এই সবকিছুই এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে যথেষ্টভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ট্রাম্প যে যুক্তরাষ্ট্রের অপরাপর প্রেসিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি ইসরায়েলপন্থি এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই তিনি ইসরায়েল-হামাসের মধ্যকার যুদ্ধ নিয়ে ইরানকে অভিযুক্ত করে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে, ইরানকে নরকের স্বাদ নিতে হবে বলে হুঁশিয়ার করেন। বহুল আলোচিত এই যুদ্ধটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলেও, গাজায় থেমে থেমে ইসরায়েলের আক্রমণ চলছে এবং এর ফলাফল হচ্ছে, বর্তমানে গাজার ৮৮ শতাংশ ভূমি ইসরায়েলের দখলে এবং তারা বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে পশ্চিম তীরে আক্রমণ পরিচালনা করছে। আক্রমণ করছে সিরিয়ায় এবং লেবাননের ১২ শতাংশ ভূমিও তারা নিজেদের দখলে নিয়েছে। ইরানকে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বারবার হুমকি বলে এলেও ইসরায়েলের কোনো অপকর্মই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অপকর্ম বলে মনে হচ্ছে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি তার সমর্থন একচুলও নড়চড় হয়নি। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং এই সময়ের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় এর মেয়াদ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে একটি চুক্তির মাধ্যমে মুখ রক্ষা করে, যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার প্রবণতা ফুটে উঠছে। ইরান এ ক্ষেত্রে অনেকটা কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় আর বিশ্বাস করতে চায় না। অতীতে আলোচনার নাম করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে তারা হামলা চালিয়েছে, ইসরায়েলের পরামর্শই প্রাধান্য দিয়েছে। সে জন্য তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের ঘাঁটিগুলোকে তুলে নিতে হবে; যুদ্ধের ফলে ইরানে যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এ রকম আরও কিছু শর্ত রয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুদ নিজেদের কাছে নিতে চায়, যা ইরান কোনোভাবেও মানতে চায় না। এমন অবস্থায় এই আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে কী দাঁড়াতে পারে এমন শঙ্কা থেকেই যায়।
এখানে আশার কথা হচ্ছে, প্রথম দফার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের অনুরোধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের স্বার্থে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে এটি নিয়ে এককথায় ইসরায়েলের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। গত ২৪ এপ্রিল দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও আক্রমণ করতে প্রস্তুত ইসরায়েল, তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের জন্য অপেক্ষা করছে। এই সবুজ সংকেত বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এটিই বোঝানো হচ্ছে যে, ইসরায়েল এ যাবৎকালে মধ্যপ্রাচ্যে যা কিছু করেছে, এর সবকিছুর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছিল। ইরান যুদ্ধের পরিণতি কী হবে, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও, এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তার নিজের পরিণতিকে নির্দিষ্ট করে ফেলেছেন। কেবল নিজের জন্যই নয়, দল এবং দেশের জন্যও তিনি নতুন কলঙ্ক যুক্ত করেছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে সে দেশের তেলসম্পদের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের অবস্থানকে অনেকটা মজবুত করে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন এবং ধারণা করেছিলেন যে, নেতানিয়াহুর পরামর্শে ইরানে সরকার হটিয়ে নিজেদের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে চমকে দেবেন। তিনি ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে যতটা দুর্বল ভেবেছিলেন, তারা যে তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের কাছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বৃদ্ধি পাবে এটি ছিল তার কল্পনার অতীত। এ বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কার্যত তার ভাগ্যের লিখন লিখে ফেলেছেন।
সৌজন্যেঃ দেশ রূপান্তর
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

