আওয়ামী লীগকে ফেরাতে নিশানায় ইউনূস: মাঠ গরমের ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে নিষিদ্ধ দলটির হাই কমান্ড

বিশেষ প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ভিন্ন আঙ্গিকে পুনর্সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক মাঠে সরাসরি বড় কোনো কর্মসূচিতে সুবিধা করতে না পেরে দলটি এখন জনমনে প্রভাব ফেলে এমন কিছু সংবেদনশীল ইস্যুকে সামনে এনে এগোতে চাচ্ছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমীকরণকে জটিল করতে আওয়ামী লীগকে ফেরাতে নিশানায় ইউনূস এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে।

ড. ইউনূস ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে খাটো করার আইনি অপচেষ্টা

দলীয় ও রাজনৈতিক একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ এখন কৌশলগত কারণে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে সরাসরি আক্রমণ না করে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করতে ওই সময়কালের বিভিন্ন সংকটকে সামনে আনা হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ‘হামের টিকার জটিলতা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বিষয়টিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি হাইকোর্টে ড. ইউনূস ও তাঁর সাবেক সরকারের উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে দলটির সমর্থিত পেশাজীবী ও আইনজীবীদের ঢাল হিসেবে সামনে রেখে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইস্যুভিত্তিক এই কর্মসূচিগুলোকে ক্রমান্বয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে প্রত্যাশা বনাম বাস্তব চিত্র

সূত্রমতে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রচণ্ড রাজনৈতিক ও আইনি চাপে থাকা আওয়ামী লীগের একাংশ একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের ধারণা ছিল, নতুন সরকার এলে তারা রাজনীতিতে কিছুটা স্পেস বা সুযোগ পাবে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে নির্বাচনের আগে ও পরে দলটির অনেক নেতাকর্মী বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সফট কর্নার বা ভোট চাওয়ার মতো কৌশলও অবলম্বন করেছিলেন।

তবে দলটির সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি। নির্বাচনের পরপরই দেশের কয়েকটি স্থানে দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা করা হলে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি নিয়ে। আওয়ামী লীগ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার হয়তো এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করবে না, কিন্তু বর্তমান সরকার হুবহু ওই আইনটির বৈধতা বজায় রেখেছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেখ হাসিনার অডিও বার্তা ও নতুন কমিটি

মাঠে প্রকাশ্য কর্মসূচির সুযোগ না থাকায় আওয়ামী লীগ এখন পুরোপুরি প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করছে। বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপস ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির অফিশিয়াল পেজ থেকে বিভিন্ন প্রচারণামূলক পোস্টারও প্রকাশ করা হচ্ছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু অডিও বার্তায় দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে নানা দিকনির্দেশনা দিতে শোনা গেছে। সেখানে তিনি দ্রুত নতুন কমিটি গঠন করে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সাথে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা বিতর্কিত কম ছিলেন এবং সামাজিকভাবে প্রভাবশালী, তাদের দিয়ে দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি দেওয়ার প্রক্রিয়াও ভেতরে ভেতরে শুরু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
তৎপরতার ধরণ কৌশল ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
আইনি ফ্রন্ট ড. ইউনূস ও সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে রিট ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দাবি।
মাঠ পর্যায়ের কৌশল ভোরবেলা বা রাতে কয়েক সেকেন্ডের ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক শোডাউন।
সাংগঠনিক ফ্রন্ট অনলাইনের মাধ্যমে তৃণমূলের সাথে যোগাযোগ ও নতুন পকেট কমিটি গঠন।
প্রচারণা ফ্রন্ট টকশো, পডকাস্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তোলা।
সচেতন মহলের উদ্বেগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বিগত সরকারের আমলের গুম, খুন, অর্থ পাচার ও বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা দেশের মানুষ এখনো ভুলে যায়নি। তাই ফ্যাসিবাদী শক্তির যেকোনো ধরণের পুনর্বাসনের চেষ্টা সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। সচেতন মহলের মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির উচিত হবে অতীত দুঃশাসনের চিত্রগুলো জনগণের সামনে বার বার তুলে ধরে জনসচেতনতা বজায় রাখা।

তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনকে দেশের মাটিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ন্যূনতম সুযোগ দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রেখেছে। যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নস্যাৎ করতে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ