আবারও নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন এস আলমের: অর্থ পাচারের দায় এড়ানোর নয়া কৌশলে সতর্ক অবস্থানে সরকার

বিশেষ প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

বিদেশে পাচারকৃত বিপুল অঙ্কের অর্থের আইনি দায় এড়ানো এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে করা আন্তর্জাতিক মামলার সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করতে আবারও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)। নিজের, স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের অনুরোধ জানিয়ে গত ফেব্রুয়ারি (২০২৬) শেষ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই আবেদন জমা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান সরকার দেশের আর্থিক ও আইনি স্বার্থ রক্ষার্থে এই আবেদন মঞ্জুর না করে চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এক নজরে এস আলম পরিবারের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব স্ট্যাটাস:

ব্যক্তির নাম পাসপোর্টের ধরণ ও মেয়াদ সর্বশেষ আবেদন (২০২৬) দাবিদার বর্তমান নাগরিকত্ব
মোহাম্মদ সাইফুল আলম ই-পাসপোর্ট (মেয়াদোত্তীর্ণ কিন্তু সক্রিয়) নাগরিকত্ব পরিত্যাগ সিঙ্গাপুর / সাইপ্রাস
ফারজানা পারভীন (স্ত্রী) ই-পাসপোর্ট (মেয়াদোত্তীর্ণ কিন্তু সক্রিয়) নাগরিকত্ব পরিত্যাগ সিঙ্গাপুর / সাইপ্রাস
আসাদুল আলম মাহির (ছেলে) এমআরপি (মেয়াদোত্তীর্ণ কিন্তু সক্রিয়) নাগরিকত্ব পরিত্যাগ সিঙ্গাপুর / সাইপ্রাস
আশরাফুল আলম (ছেলে) পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডেটাবেজে তথ্য নেই নাগরিকত্ব পরিত্যাগ সিঙ্গাপুর / সাইপ্রাস

নাগরিকত্ব মঞ্জুর করলে সরকারের সামনে বড় দুই ঝুঁকি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন এস আলমের ফাইলটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর সরকার প্রাথমিকভাবে দুটি বড় ধরণের আইনি ও কৌশলগত ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে:

  • ১. পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জটিলতা: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম গোষ্ঠী দেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এখন নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে এই অর্থ ফেরত আনার আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়বে।

  • ২. আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় দুর্বলতা: সাইফুল আলম নিজের সম্পদ সুরক্ষার দাবি তুলে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে (ICSID) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তিনি যদি নিজেকে বিদেশী নাগরিক হিসেবে পূর্ণ প্রমাণ করতে পারেন, তবে ওই আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

আওয়ামী লীগ আমলের ‘স্মারক’ ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা

এর আগে ২০২০ সালেও সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের অজুহাতে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করেছিলেন এস আলম। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালের ১৯ জুলাই এক স্মারকের মাধ্যমে তা মঞ্জুর করেছিল।

তবে সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের নভেম্বরে ইসলামী ব্যাংক হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ূম আদালতে প্রশ্ন তোলেন, “সাইফুল আলম যদি ২০২০ সালেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তবে তিনি কীভাবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশি নাগরিক সেজে বিভিন্ন কোম্পানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নিলেন?” এই রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আওয়ামী লীগ আমলের সেই বিতর্কিত স্মারকটি স্থগিত করে দেন। ফলে এস আলমের নাগরিকত্বের বিষয়টি আইনি মারপ্যাঁচে অমীমাংসিতই থেকে যায়।

সাইপ্রাস নাকি সিঙ্গাপুর: নাগরিকত্ব নিয়ে চরম ধোঁয়াশা

সাইফুল আলম আসলে কোন দেশের নাগরিক, তা নিয়েও রয়েছে বড় রহস্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা যায়, ২০১৬ সালে তাঁর নামে সাইপ্রাসের পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল। আবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস আলম পরিবার ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। যেহেতু সিঙ্গাপুরে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নেই, সেহেতু তিনি সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব বাতিল করেছেন কি না, সেই তথ্য বাংলাদেশ সরকারের জানা নেই।

আগামী ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে শুনানি: লড়বে বাংলাদেশ

২০০৪ সালের বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির দোহাই দিয়ে এস আলম আন্তর্জাতিক আদালতে দাবি করেছেন যে, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে তাঁদের বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আওতাধীন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে করা এই মামলার শুনানি আগামী ২২ জুন ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে, এই মামলা আন্তর্জাতিক আদালতে লড়তে সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে একটি ব্রিটিশ ল ফার্মকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার বর্তমানে দুদক, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিএফআইইউ (BFIU) সহ সাতটি সংস্থার কাছ থেকে এস আলম পরিবারের ঋণ ও মামলার নথিপত্র সংগ্রহ করছে। প্রতিবেদন পূর্ণাঙ্গ হাতে পাওয়ার পরই নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়ে চূড়ান্ত নেতিবাচক বা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সর্বশেষ নিউজ