জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে ভারত সরকারের মনোভাব কী? ঢাকাকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা দিল্লির

ডেস্ক রিপোর্ট
spot_img
spot_img

বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন নির্বাচনের পর ঢাকার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে চায় নতুন দিল্লি। তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই নতুন যাত্রায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়ে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের পুরোনো উদ্বেগ ও কৌশলগত আপত্তি এখনো বহাল রয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে সুষমা স্বরাজ ভবনে সফররত বাংলাদেশের মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রাক্তন উপ-উপদেষ্টা এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ জামায়াতকে নিয়ে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রতি ভারতের প্রত্যাশার কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন। প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটস্ট্র্যাট’-এর এই কর্ণধার স্পষ্ট জানান, পাকিস্তান ব্যতিরেকে বাংলাদেশসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিবেশীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে চায় ভারত, তবে সে ক্ষেত্রে ভারতের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ইস্যুটি হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

পঙ্কজ শরণের বিশ্লেষণে: জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে ভারত সরকারের মূল ৪টি উদ্বেগ

উদ্বেগের প্রধান ক্ষেত্র ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১. নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) বিচ্ছিন্নতাবাদী হুমকি নিয়ে ভারত সতর্ক। অতীতে ২০০১-২০০৬ জোট সরকারের আমলে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড ও অস্ত্র চোরাচালানের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে দিল্লির।
২. আদর্শিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটি ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ দেখালেও ঐতিহাসিক কারণে দিল্লি তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না।
৩. সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কট্টরপন্থী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর উত্থানে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক অখণ্ডতা ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করে ভারত, যা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে।
৪. ভূ-রাজনৈতিক জোট জামায়াত যদি সমমনা কোনো কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সাথে সরকার গঠনে বড় প্রভাব বিস্তার করে, তবে তা এই অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী হবে।

জামায়াতকে ক্ষমতার বাইরে রেখে নতুন সরকারকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’

পঙ্কজ শরণ তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক ও কৌশলগত অভিজ্ঞতা থেকে ইঙ্গিত দেন যে, জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ায়, ভারত তাদেরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখতে মোটেও আগ্রহী নয়। তবে জামায়াতের এই ছায়া থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব, তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ ‘বেনিফিট অব ডাউট’ (সন্দেহের ঊর্ধ্বে রেখে সুযোগ দেওয়া) দিতে চায় দিল্লি।

২০০১ থেকে <নভেম্বর ২০২৬> পর্যন্ত বিএনপির বিগত শাসনামলে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে ঢাকার সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করার প্রসঙ্গ টেনে এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, “সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়। বাংলাদেশের নতুন এক নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেছে। আমরা মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ দেখছি। সব মিলিয়ে এটি সম্পূর্ণ একটি নতুন পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চাই। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হবে এবং ২০০১-২০০৬ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।”

মোদি-তারেক ফোনকল ও দিনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ: সম্পর্কের নতুন মোড়

পঙ্কজ শরণ উল্লেখ করেন যে, ড. ইউনূসের আমলের সম্পর্কের আবহের চেয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আবহ অনেকটাই ভিন্ন ও ইতিবাচক। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং তার পরের দিনই তারেক রহমানও টুইট করে তার জবাব দেন। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটি ফলপ্রসূ ফোনকলও অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক নতুন ধরনের সম্পর্ক খুঁজে বের করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।

সম্পর্ক জোরদারে ভারতের সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে তিনি বলেন, “ভারত সরকার বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে প্রবীণ রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদীর নাম ঘোষণা করেছে। ১৯৭১ সালের পর তিনিই প্রথম রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত হাইকমিশনার। এর অর্থ হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে এমন কাউকে ঢাকায় পাঠাতে চান, যিনি সরাসরি তাঁর প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং যার ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।”

শেখ হাসিনার আশ্রয়, তিস্তা প্রকল্প ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি

দিল্লিতে শেখ হাসিনার অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ১৭ বছর ধরে লন্ডনে আশ্রয়ে ছিলেন। তাই কেউ অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়াটা রাজনীতি ও আইনি বিষয়ের অংশ। শেখ হাসিনা এই প্রথম দিল্লিতে আশ্রয় নেননি; ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লিতেই ছিলেন এবং জিয়াউর রহমানের সময়েই তিনি দেশে ফিরেছিলেন। রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।” তবে উল্লেখ্য যে, পূর্বের আশ্রয়ের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমানের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আশ্রয়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে তিনি একে অত্যন্ত ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সুসম্পর্কের ওপর জোর দেন। এছাড়া তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতায় তিস্তায় ব্যারাজ নির্মাণ করতে চায়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, ভারত এখানে বাধা দিতে পারে না, শুধু অভিন্ন নদী হিসেবে নিজের উদ্বেগের কথা জানাতে পারে।” অপরদিকে আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নে পানিপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর (Base Year) পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

পরিশেষে, দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে পঙ্কজ শরণ বলেন, ইতিহাস, ভূগোল ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে কোনো প্রতিবেশী চলতে পারে না এবং দিল্লি ও ঢাকা—উভয় পক্ষই প্রজ্ঞার সাথে এই দ্বিপক্ষীয় বাস্তবতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সর্বশেষ নিউজ