আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগ মুহূর্তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার ও কোরবানি সংক্রান্ত এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দূরগামী রায় দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়ে জানিয়েছেন, গরু কোরবানি দেওয়া ঈদ বা ঈদুল আজহা উৎসবের কোনো অপরিহার্য অংশ নয় এবং ইসলামের ধর্মীয় বিধানেও এটি কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম বা বিধান নয়। এর পাশাপাশি রাজ্য সরকারের জারি করা উন্মুক্ত বা জনপরিসরে গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন আদালত।
ভারতের খ্যাতনামা আইনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘লাইভ ল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের দেওয়া পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আদেশের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার (২০ মে ২০২৬) কলকাতা হাইকোর্ট এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
সুপ্রিম কোর্টের পুরোনো মামলার নজির ও হাইকোর্টের বেঞ্চ
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ জনপরিসরে গরু ও মহিষ জবাই করার ওপর রাজ্য সরকারের জারি করা কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে এই আদেশ দেন।
রায়ের লিখিত আদেশে আদালত দুটি সুনির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করেন। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের কোনো উন্মুক্ত বা প্রকাশ্য জনপরিসরে গরু, মহিষসহ অন্য কোনো প্রাণী জবাই করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। দ্বিতীয়ত, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক নজির টেনে আদালত বলেন, ‘ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পূর্বের “মো. হানিফ কোরেশি ও অন্যান্য বনাম বিহার রাজ্য” মামলায় অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে—গরু কোরবানি দেওয়া ঈদুল আজহা উৎসবের কোনো অংশ নয় এবং ইসলামের অধীনে এটি কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান হিসেবে গণ্য হয় না।’
কলকাতা হাইকোর্টের রায় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞপ্তির সারসংক্ষেপ:
| রায়ের মূল বিষয় ও আদালত | চ্যালেঞ্জকারী পিটিশন দাতা | রাজ্য সরকারের মূল বিধিমালা (১৩ মে) | আইনি ধারা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ |
| কলকাতা হাইকোর্ট (বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থ সারথি সেন)। | মহুয়া মৈত্র (এমপি, টিএমসি) ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। | উন্মুক্ত স্থানে পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও সরকারি ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বাধ্যতামূলক। | ‘প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’-এর ১২ ধারার অধীনে রাজ্য সিদ্ধান্ত নেবে। |
শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের বিজ্ঞপ্তি ও মহুয়া মৈত্রের পিটিশন
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার গত ১৩ মে একটি বিশেষ প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। ওই বিজ্ঞপ্তিতে উৎসবের সময় পশু জবাই নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ফায়ারব্র্যান্ড সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রসহ পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সরকারের এই নতুন বিজ্ঞপ্তিকে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ দাবি করে কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। পিটিশনকারীরা আসন্ন ঈদুল আজহায় প্রাচীন ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচার স্বাধীনভাবে পালনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক ‘প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’-এর ১২ ধারার অধীনে বিশেষ ছাড় বা অনুমতি চেয়েছিলেন।
ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক ও আদালতের নির্দেশনা
তবে পিটিশনকারীদের দাবির মুখে তাৎক্ষণিক কোনো আইনি স্থগিতাদেশ না দিয়ে আদালত রায়ে বলেন, “কয়েকজন পিটিশনকারীর চাওয়া এই বিশেষ ছাড়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক। তাই ১৯৫০ সালের ওই আইনের ১২ ধারার আওতাধীন নিয়ম মেনে রাজ্য সরকারকেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।”
উল্লেখ্য, গত ১৩ মে জারি করা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওই বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, উপযুক্ত সরকারি কর্তৃপক্ষের দেওয়া অফিশিয়াল ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা পশুর সুস্থতার ছাড়পত্র ছাড়া রাজ্যের কোথাও কোনো প্রাণী জবাই করা যাবে না। এই নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, কোনো অবস্থাতেই যেন রাস্তাঘাট, মাঠ বা উন্মুক্ত জনপরিসরে কোনো প্রাণী জবাই না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট এই আদেশে সিলমোহর দেওয়ায় আসন্ন ঈদে পশ্চিমবঙ্গে কোরবানি পশুর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

