“আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, একজন খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।”—আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর এক গোলটেবিল বৈঠকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে ধ’র্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া মাত্র আট বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুর হতভাগ্য পিতা। ধ’র্ষক ও খুনিদের নির্মমতায় খণ্ডবিখণ্ড হওয়া নিজের কলিজার টুকরো সন্তানের বিচার চাইতে গিয়ে তাঁর বুকফাটা আর্তনাদে উপস্থিত সবার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
আজ শনিবার (৬ জুন ২০২৬) রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তিনি এই হৃদয়বিদারক বক্তব্য দেন। বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করে।
‘আমাকে আমার সম্মান ফিরিয়ে দেন’—হাত জোড় করে আকুতি পিতার
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া দিয়ে পল্লবীর সেই শিশুটির বাবা প্রশ্ন তোলেন, “আমি জানতে চাই—এই দায়িত্ব কে নেবে? এই দায়িত্ব কি আমার অবহেলা, সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা? আমি আজকে খণ্ডবিখণ্ড আমার খুকুর সোনার টুকরা সন্তান—তার দায়িত্ব কে নেবে? আমি কি তার জন্য দায়ী? না কে দায়ী?”
বৈঠকে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে এই অসহায় পিতা আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমি তো একজন ধর্ষিতার বাবা হয়ে থাকতে চাই না। আমি তো গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছি। আপনারা আমাকে সেই নাম ফিরিয়ে দেন, আমাকে সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন। যদি তা না পারেন, তবে অন্তত এমন একটা সমাজব্যবস্থা দেন, যেই ব্যবস্থায় আর কোনো দিন কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না। আর কোনো বাবা-মায়ের সারা জীবনের জন্য কান্নার পথ খোলা থাকবে না এবং তারা জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে থাকবে না।”
১৩ দিন পরও কাটেনি মানসিক ট্রমা, আতঙ্কিত দেশের শিশুরা
সন্তান হারানোর বীভৎস স্মৃতি মনে করে এই বাবা জানান, ঘটনার ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্ত্রী তীব্র মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। তিনি বলেন, “আমার স্ত্রী কোথায় যায়, কী বলে, নিজেই জানে না। তাকে প্রতিনিয়ত দেখভাল করতে হচ্ছে। সে কোনো দিন সুস্থ হবে কি না, আল্লাহই ভালো জানেন।” নিজের বড় মেয়েকে নিয়েও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এই আতঙ্ক শুধু তাঁর পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আজ পুরো বাংলাদেশের শিশুদের মনের অবস্থা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “গতকাল আমার বাড়িতে পাঁচ বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে এসেছিল। সে ইতিমধ্যে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি শিখে গেছে, অথচ এই বয়সে তার তা জানার কথা নয়। সেই শিশুটি এখন এতটাই আতঙ্কিত যে একা টয়লেটেও যেতে পারছে না, মায়ের আঁচল ছাড়া এক পা নড়ছে না।” তিনি এই পরিস্থিতির অবসান চেয়ে তাঁর মেয়ে হত্যার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
আগামীকাল ঐতিহাসিক রায়, গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে এই শিশুর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর মূল আসামি সোহেল শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে তাকে এবং তার স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রেকর্ড গতিতে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে আগামীকাল ৭ জুন (রবিবার) এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে অংশ নেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান এবং সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী রাশনা ইমাম প্রমুখ। বক্তারা প্রত্যেকেই শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেন।
(আইনি বাধ্যবাধকতা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুসারে এই প্রতিবেদনে নিহত শিশু ও তার পরিবারের পরিচয় এবং নাম প্রকাশ করা হলো না।)

