নিয়োগ বাণিজ্য আর দুর্নীতির আখড়া খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

খুলনা কার্যালয়
spot_img
spot_img

শুরু থেকেই নানা অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহার যেখানে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে, সেই খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এখন রূপ নিয়েছে ওপেন সিক্রেট নিয়োগ বাণিজ্য আর দুর্নীতির আখড়ায়। দেশজুড়ে ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে, দেশে বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এসেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে উপাচার্যও বদল হয়েছে। কিন্তু এতসব নাটকীয় পরিবর্তনের পরও এই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানটি তার পুরনো দুর্নীতির পঙ্কিল আবর্ত ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে বের হতে পারেনি। একের পর এক বিধি বর্হিভূত নিয়োগ, বয়স জালিয়াতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখানে বহাল তবিয়তে চলছে দুর্নীতি।

নিয়োগের আগেই বেতন চালু! পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বয়স জালিয়াতি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ পান জনাব মোহাম্মদ সাহিদ আলী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো: রেজাউল ইসলামের ইস্যু করা নিয়োগপত্রে এক অদ্ভুত জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, এই নিয়োগটি ৫ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হবে! অর্থাৎ, সাহিদ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার ৩ দিন আগে থেকেই তার বেতন-ভাতা চালু করার অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত নির্ধারিত বয়সসীমার চেয়েও তার বয়স অনেক বেশি ছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থিত অফিসার সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই জালিয়াতি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বড় ধরণের অডিট আপত্তি রয়েছে। এ ব্যাপারে মো: সাহিদ আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের বর্ধিত বয়সের কথা অকপটে স্বীকার করে দাবি করেন, বয়স বেশি হলেও তার অন্য ধরণের বিশেষ যোগ্যতা রয়েছে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত নিয়োগ ও আপত্তির খতিয়ান:

বিতর্কিত কর্মকর্তা/শিক্ষকের নাম পদবি ও বিভাগ জালিয়াতি ও অনিয়মের মূল ধরণ তদারকি সংস্থার আইনি অবস্থান
মোহাম্মদ সাহিদ আলী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক যোগদানের আগেই বেতন শুরু ও বয়স জালিয়াতি। অডিট আপত্তি বিদ্যমান।
এস এম মনিরুজ্জামান প্রধান প্রকৌশলী দুদক মামলার আসামি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন। খুবি কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
জহুরুল জান্নাত প্রিয়া সহকারী অধ্যাপক, সিএসই নীতিমালা বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত বয়সে নিয়োগ। ইউজিসির (UGC) সরাসরি আপত্তি।
ড. ওয়াহেদা রহমান আনসারী সহকারী অধ্যাপক, বায়োকেমিস্ট্রি বিজ্ঞপ্তির শর্ত লঙ্ঘন ও বয়সসীমা পার। ইউজিসির (UGC) তীব্র আপত্তি।

দুদকের মামলার আসামি যেভাবে হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চীফ ইঞ্জিনিয়ার’

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৌশল দপ্তরের চিত্র আরও ভয়াবহ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি চীফ ইঞ্জিনিয়ার এস এম মনিরুজ্জামান বিগত ১৫ বছর ধরে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করে গেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ জন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জুলাই বিপ্লবের পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই দুর্নীতিবাজ এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলাও চলমান রয়েছে।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সব ফৌজদারি অপরাধ ও শাস্তির তথ্য গোপন করে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শীর্ষ মহলের সাথে মোটা অঙ্কের অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি এখানে সরাসরি ‘চীফ ইঞ্জিনিয়ার’ বা প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল পদ বাগিয়ে নেন। এ ব্যাপারে এস এম মনিরুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য না করে পরে কথা বলবেন বলে জানান।

ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়ের আপত্তি উড়িয়ে শিক্ষক পদে গণনিয়োগ

একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স (সিএসই) বিভাগেও সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূতভাবে বয়স বেশি থাকা সত্ত্বেও জহুরুল জান্নাত প্রিয়াকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছে। যোগাযোগ করা হলে জহুরুল জান্নাত প্রিয়া ইউজিসির আপত্তির কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা ও প্রকাশনা থাকায় তার নিয়োগ সঠিক আছে। তবে তিনি কথায় কথায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের চলমান সত্যতা স্বীকার করে নেন।

অনুরূপভাবে, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগেও বিজ্ঞপ্তির শর্ত লঙ্ঘন করে অনেক বেশি বয়সের ড. ওয়াহেদা রহমান আনসারীকে সহকারী অধ্যাপক পদে বসানো হয়েছে, যার বিরুদ্ধেও ইউজিসির অডিট আপত্তি রয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে আফসানা ইয়াসমিন, কারিমুন্নেসা, জাতিয়া সুলতানা, রিমু দাস, আরিফুল ইসলাম, মাহমুবা মিশু, আসমাইল হুসনা, ফৌজিয়া বাহার, মৌসুমী আক্তার সুমি এবং নুসরাত মুমুকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এইসব ধারাবাহিক জালিয়াতি ও বাণিজ্যিক নিয়োগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত শনিবার খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে মোবাইল মেসেজে বিস্তারিত লিখে কথা বলতে চাইলেও তিনি কোনো ধরণের জবাব দেননি। উপাচার্যের এই রহস্যজনক নীরবতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের দুর্নীতি সিন্ডিকেটকেই আড়াল করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ নিউজ