নৈতিক মনোবল বৃদ্ধির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে আরও জনবান্ধব করা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে ‘শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন’ এবং একই সাথে ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ (Punishment and Reward) নীতি বাস্তবায়নে গভীরভাবে বিশ্বাসী বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই মূলনীতির আলোকেই মূলত নৈতিক মনোবল বৃদ্ধির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও বেশি সেবামুখী ও জনবান্ধব করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভালো কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও মন্দ কাজের জন্য তিরস্কারের এই জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে আরও বেশি কর্তব্যপরায়ণ, আন্তরিক ও ন্যায়নিষ্ঠ হতে অনুপ্রাণিত করবে।

আজ সোমবার (৮ জুন ২০২৬) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাম্প্রতিক দেশব্যাপী তিনটি সাড়া জাগানো ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের প্রশংসনীয় অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সচিবালয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন: ১৫ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ পুরস্কার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তিনটি বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনায় সর্বমোট ১৫ জন পুলিশ সদস্যের হাতে সম্মাননা সনদ ও আর্থিক পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যেককে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ তহবিল থেকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয় এবং ৩ জন নৌ পুলিশ সদস্যকে আইজি ব্যাজ (IG Badge) পরিয়ে দেওয়া হয়।

ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, অতীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ ধরনের পুরস্কার বিতরণের আয়োজন সচরাচর দেখা যায়নি। সাধারণত রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স বা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এ ধরনের পদক বা ব্যাজ প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে মাঠপর্যায়ে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের তাৎক্ষণিক মনোবল বৃদ্ধি এবং নৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী (Morally Boost-up) করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই বিশেষ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের আইনানুগ ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

পুরস্কারের আওতায় আসা ৩টি সাড়া জাগানো ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরন:

সফল অভিযানের বিবরণ ও নাম আভিযানিক দলের নেতৃত্ব ও সদস্য অনন্য কৃতিত্ব ও অর্জিত সাফল্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ পুরস্কার ও ব্যাজ
১. পল্লবী থানার রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড এসি মো. জাহিদ হোসেন ও এসআই অহিদুজ্জামানসহ ৯ জন। দ্রুততম সময়ে আসামি গ্রেফতার, ডিএনএ টেস্ট ও সফল তদন্ত সম্পন্ন। ৯ জন কর্মকর্তাকে সনদ ও নগদ ২০ হাজার টাকা করে প্রদান।
২. দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নৌ পুলিশের বীরত্ব এসআই মোহাম্মদ আবুজার গিফারীসহ মোট ৩ জন কর্মকর্তা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীবাহী বাস খালি করে ৫০ জন যাত্রীর প্রাণ রক্ষা। ৩ জন নৌ পুলিশ সদস্যকে দাপ্তরিক আইজি ব্যাজ (IG Badge) প্রদান।
৩. মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ক্লু-লেস কিশোরী খুন পিবিআই মুন্সীগঞ্জের এসআই রনি দেবনাথসহ ৩ জন কর্মকর্তা। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মাত্র ১ দিনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ক্লু-লেস হত্যার রহস্যভেদ। ৩ জন কর্মকর্তাকে সনদ ও নগদ ২০ হাজার টাকা করে অনুদান।

২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নিয়ে যে চরম সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। পুলিশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। বিগত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অপরাধ চিত্রের তুলনামূলক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি জানান, বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং প্রতিটি ক্যাটাগরিতে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক এক দুর্নীতি ও আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত রিপোর্টের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয় এবং তারা মাঠপর্যায়ে কোনো প্রকার বাস্তব তদন্ত বা জাজমেন্ট না করে শুধুমাত্র পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করে। তাই এই প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায় থেকে নিয়মিত ও রুটিন ওয়ার্কের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে থাকে, যা সম্পূর্ণ সন্তোষজনক। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদকেই মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

তদন্তের বাজেট বৃদ্ধি ও অপরাধী কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তি

মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের সরকারি বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান জাতীয় আর্থিক সক্ষমতা ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে তদন্ত বা পোস্টমর্টেমের ক্ষেত্রে যে বরাদ্দ রয়েছে তা হয়তো সম্পূর্ণ পর্যাপ্ত নয়। তবে ভবিষ্যতের দিনে তদন্ত কার্যক্রম, পোস্টমর্টেম ও পুলিশি টহল আরও গতিশীল করতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

বিগত সময়ে পলাতক থাকা বা জালিয়াতিতে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত অপর এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, পলাতক বা শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অনুকম্পা বা ছাড় দেখানো হবে না। ইতোমধ্যে আলোচিত কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী একাধিক বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই সাথে যাদের বিরুদ্ধে আইসিটি অ্যাক্ট বা দণ্ডবিধির অধীনে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, তারা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বিচারের সম্মুখীন হবেন। অপরাধী যেই হোক, কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে মন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

উক্ত জমকালো অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ-সহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ নিউজ