ইসলামী ব্যাংকে দুই ঘণ্টার ‘কলম বিরতি সেবা কার্যক্রমে স্থবিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

দেশের বৃহত্তম শরীয়াহভিত্তিক বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-তে বড় ধরণের প্রশাসনিক অস্থিরতা ও গ্রাহক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগসহ মোট সাত দফা দাবিতে গতকাল সোমবার (৮ জুন) দেশব্যাপী ইসলামী ব্যাংকে দুই ঘণ্টার কলম বিরতি পালন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ বিশেষ আহ্বানে এই ব্যতিক্রমী ও কঠোর কর্মসূচিটি পালন করা হয়।

সোমবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই কলম বিরতি কর্মসূচি চলে। এই দুই ঘণ্টা ব্যাংকের প্রায় সব ধরণের স্বাভাবিক লেনদেন বন্ধ থাকায় গ্রাহক সেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

রাজধানীসহ দেশজুড়ে স্থবিরতা: শাখাগুলোর সামনে গ্রাহকদের অবস্থান

কর্মসূচি চলাকালীন সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার শাখা ও উপশাখাগুলোতে ব্যাংকিং কার্যক্রমে আংশিক ও সাময়িক স্থবিরতা নেমে আসে। সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই দুই ঘণ্টা নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনসহ বেশিরভাগ ব্যাংকিং সেবা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। একই সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা ও উপশাখার প্রধান ফটকের সামনে সাধারণ আমানতকারীরা জড়ো হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

সরেজমিনে রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, মতিঝিল লোকাল অফিস, মতিঝিল শাখা ছাড়াও বাসাবো, শাহজাহানপুর, পল্টন, রমনা, বংশাল, নবাবপুর, ইসলামপুর, সদরঘাট, কামরাঙ্গীরচর, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, দয়াগঞ্জ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, পান্থপথ, কাকরাইল, গেন্ডারিয়া, ওয়াইজঘাট ও বাংলামোটরসহ বিভিন্ন শাখা ঘুরে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টেবিলে কাজ বন্ধ রেখে কলম বিরতি পালন করছেন। এর ফলে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়। তবে অচলাবস্থার আশঙ্কায় এসব স্থানে সাধারণ গ্রাহকদের দৈনিক উপস্থিতি অন্য দিনগুলোর তুলনায় কিছুটা কম ছিল।

খুরশীদ আলমের পদত্যাগ ও এস আলম গ্রুপ মুক্ত করার দাবি

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিক আন্দোলনের কারণ ব্যাখ্যা করে গণমাধ্যমকে বলেন, “বর্তমান অবৈধ চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের অবিলম্বে পদত্যাগ, সাধারণ মানুষের আমানতের পূর্ণ সুরক্ষা, গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষা, বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ ও তাদের দোসর-সহযোগীদের ব্যাংক থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর পুলিশি হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাতেই আমরা এই ৭ দফা দাবিতে কলম বিরতি ডেকেছি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ব্যাংকের ভেতর চলমান তীব্র তারল্য সংকটের অজুহাতে প্রধান কার্যালয়ের প্রধান এটিএম বুথসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বুথগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীরা তাদের জরুরি প্রয়োজনে জমানো টাকা তুলতে না পেরে চরম ভোগান্তি ও জাঁতাকলে পড়েছেন। ব্যাংকের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সাধারণ গ্রাহকদের মনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দিন দিন বাড়ছে।

কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নীরবতা

গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুর নবী মানিক স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর স্বার্থ এবং তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনগুলোতে ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষায় আরও কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। এদিকে, ব্যাংকের ভেতরে কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের এই নজিরবিহীন আন্দোলন ও কলম বিরতির বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টরা ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের যেকোনো ধরণের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সাধারণ গ্রাহকদের আস্থার সংকটে ফেলবে। এটি কেবল এই ব্যাংকের ক্ষতি করবে না, বরং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতি দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সর্বশেষ নিউজ