বিয়ের আগের সম্মতিপূর্ণ প্রেমের সম্পর্ক বা শারীরিক সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির চরিত্রের দোষ বা কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না বলে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা ও সময়ের পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনকে এ বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।
বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি মনমোহনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সম্প্রতি এই পর্যবেক্ষণ দেন। সোমবার (৮ জুন) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে এই খবর জানিয়েছে।
আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র যাচাই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিক সমাজে বিয়ের আগের প্রেমের সম্পর্ক খুবই সাধারণ বিষয়। এটিকে কোনো ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরির কারণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়, “সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিয়ের আগের সম্পর্কের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সংবেদনশীল হতে হবে। দুই অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা শারীরিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই তাদের চরিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এমন সম্পর্কের ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞাও নেই।”
যে ঘটনায় এই রায়: তেলেঙ্গানায় এক পুলিশ কনস্টেবল পদপ্রার্থীর চাকরি বাতিলের ঘটনায় করা আপিলের শুনানিতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এই রায় দেন। তেলেঙ্গানা স্টেট লেভেল পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড একটি পুরোনো ফৌজদারি মামলার কারণ দেখিয়ে ওই প্রার্থীকে চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছিল।
জানা যায়, ওই প্রার্থী চাকরির আবেদনের সময়ই জানিয়েছিলেন যে তার বিরুদ্ধে একটি পুরোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এক নারী অভিযোগ করেছিলেন, প্রায় চার বছর প্রেমের পর ওই ব্যক্তি তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেন। এরপর ওই নারী প্রতারণার মামলা করেন। তবে মামলায় ধর্ষণের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। পরে বিচার শুরুর আগেই উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে লোক আদালতে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।
কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি এবং প্রার্থীর পূর্ণ তথ্য প্রকাশের পরও নিয়োগ কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করে। তাদের যুক্তি ছিল—সমঝোতা মানে অপরাধ স্বীকার করা।
সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ কর্তৃপক্ষের এই যুক্তিকে ‘যুক্তিহীন’ ও ‘বিকৃত ব্যাখ্যা’ বলে মন্তব্য করেছেন। আদালত বলেন, “সব সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত বিয়েতে পরিণত হয় না। তাই সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়নি বলেই একজন অন্যজনকে প্রতারণা করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।”
একইসঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা অপরাধমূলক অতীত খতিয়ে দেখার অধিকার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের রয়েছে। তবে এর ভিত্তিতে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হলে অপরাধ সংঘটন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ থাকতে হবে।
সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট ওই পুলিশ কনস্টেবল পদপ্রার্থীর আপিল মঞ্জুর করে তার নিয়োগের নির্দেশ বহাল রেখেছেন।

