যাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছে দেশের শত শত মেধা, যাঁর ক্লাসরুমে আলো ছড়াতো জ্ঞানের খনি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই আদর্শ শিক্ষকের কপালেই জুটলো বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়াল! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কৃতি শিক্ষার্থী এবং রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজসহ একাধিক নামী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রেজাউল হারুন বাবু (৭০) এখন রংপুরের একটি বৃদ্ধাশ্রমের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের বাসিন্দা। পারিবারিক মান-অভিমান আর সন্তানের দেওয়া তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের জেরে গত কয়েক বছর ধরে তিনি নিজেকে পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রেখেছেন। বর্তমানে রংপুরের ময়না কুঠি বক্সা এলাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে চরম একাকীত্বে কাটছে এই প্রবীণ শিক্ষকের জীবন।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় জন্ম নেওয়া অধ্যাপক রেজাউল হারুনের অতীত ও শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। তাঁর বাবা ছিলেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। বাবার পথ ধরেই রংপুর হাই স্কুল ও ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ থেকে মেধার স্বাক্ষর রেখে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়। কর্মজীবনে তিনি মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি শহীদ তিতুমীর কলেজ এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজে অত্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেছেন।
চার বছর আগের সেই কালো মেঘ ও ঘর ছাড়ার গল্প
অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন শেষে অবসরে যাওয়ার পর চার বছর আগে তাঁর একমাত্র ছেলের বিয়ের পর থেকেই পরিবারে এক ধরনের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এ সময় পারিবারিক একটি অতি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছেলের করা একটি নির্মম মন্তব্যে তীব্রভাবে মর্মাহত ও আত্মসম্মানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি গৃহত্যাগ করেন। ঘর ছাড়ার পর আত্মসম্মান রক্ষার্থে ও বেঁচে থাকার তাগিদে একসময় এই গুণী অধ্যাপককে রাস্তায় দিনমজুরির কাজও করতে হয়েছে! শেষ পর্যন্ত গত প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি ময়না কুঠির এই বৃদ্ধাশ্রমটিকে নিজের শেষ ঠিকানা করে নিয়েছেন। বর্তমানে নিজের স্ত্রী-সন্তান বা পরিবারের কারোর সাথেই কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখছেন না তিনি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু তালিকায় বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব থাকলেও, আত্মসম্মানের কারণে তিনি কারও সাহায্য নেননি।
অধ্যাপক রেজাউল হারুন বাবুর জীবন ও বর্তমান ট্র্যাজেডি:
| পরিচয় ও বয়স | গৌরবময় শিক্ষাজীবন | যেসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন | বর্তমান ঠিকানা ও জীবনাবস্থা |
| অধ্যাপক রেজাউল হারুন বাবু (৭০)। | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), কারমাইকেল কলেজ। | মিরপুর বাংলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল কলেজ। | ময়না কুঠি বক্সা এলাকার বৃদ্ধাশ্রম, রংপুর (বিগত ১.৫ বছর)। |
পিতার বুকে কুঠারাঘাত: ভেঙে ফেলেছিলেন নিজের ফোন
বৃদ্ধাশ্রমের বিছানায় বসে অশ্রুসজল চোখে অধ্যাপক রেজাউল হারুন বাবু সেই অভিশপ্ত দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, জীবনযাত্রার সবকিছুই আর দশটা পরিবারের মতোই স্বাভাবিক ছিল তাঁর। কিন্তু কয়েক বছর আগের একটি সাধারণ ঘটনাই তাঁর গোছানো জীবনের সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। একদিন তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ থাকার কারণে তাঁর সন্তান আদনানকে বাজার করে আনার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু সন্তান সেইদিন দায়িত্ব নেওয়ার বদলে ক্ষুব্ধ হয়ে বাবার মুখে মুখ তুলে বলেছিল, “আমি বাজার করে আনব আর তুমি বসে বসে খাবে।” সন্তানের এই একটি মাত্র বাক্য একজন আদর্শ শিক্ষকের এবং সর্বোপরি একজন জন্মদাতার হৃদয়ে এতটাই গভীর আঘাত হানে যে, সেদিনই তিনি ঘর ছাড়ার মতো কঠিন ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমনকি সমাজ ও পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবেন না বলে নিজের হাতের মুঠোফোনটিও সেদিন ছেলের সামনেই আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেন তিনি। তবে বুকে সমুদ্রসম গভীর অভিমান থাকলেও, নিজের সন্তানের প্রতি কোনো ক্ষোভ বা অভিশাপ নেই বলে জানান এই কোমলমতি অধ্যাপক। উল্টো এটিকে তিনি নিজেকে ‘পিতা হিসেবে ব্যর্থতা’ বলেই গণ্য করেন এবং প্রতিনিয়ত সন্তানের মঙ্গলের জন্য চোখের জল ফেলেন ও দোয়া করেন।
“ছাত্ররা আজ দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, অথচ স্যার এখানে”
ময়না কুঠি বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা রেজাউল করিম এই গুণী মানুষকে পেয়ে যেমন গর্বিত, তেমনই মর্মাহত। তিনি বলেন, “এমন একজন উচ্চশিক্ষিত, সজ্জন ও আদর্শ শিক্ষক আমাদের আশ্রমে আছেন, এটি আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত বেদনার ও লজ্জার। ওনার অসংখ্য ছাত্র আজ দেশে-বিদেশে সরকারের বড় বড় পদে প্রতিষ্ঠিত। আমরা ওনাকে আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের সকলের প্রত্যাশা, সব মান-অভিমান ভুলে দ্রুতই এই গুণী শিক্ষক আবার নিজের স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনে ফিরে যাবেন।”
শেষ ইচ্ছা: স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে চান নিজস্ব নীড়ে
জীবনের এই অন্তিম প্রান্তে এসে এই প্রবীণ অধ্যাপক নিজের একটি গোপন ও শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, রংপুর নগরীর অভিজাত এলাকা সেনপাড়ায় তাঁর একটি নিজস্ব বহুতল বাড়ি রয়েছে। কোনোভাবে যদি সেই বাড়িটি বিক্রয় করা সম্ভব হয়, তবে সেই অর্থ দিয়ে তিনি একটি ছোট বাসা ভাড়া নেবেন এবং নিজের সহধর্মিণীকে (স্ত্রী) সাথে নিয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে পার করতে চান। সন্তানের প্রতি আকাশসম অভিমান থাকলেও, স্ত্রীর প্রতি তাঁর এই নিখাদ দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানরত অন্যান্য বাসিন্দা ও সমাজকর্মীদের মাঝে এক অন্যরকম আলোড়ন ও আবেগের সৃষ্টি করেছে।

