তীব্র গরমে সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ৪ শিশুসহ ১২ জন, সীমান্তে বিজিবির রেড অ্যালার্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img
spot_img

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় এক শ্বাসরুদ্ধকর ও চরম অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের (ঠেলে দেওয়া) শিকার হয়ে তীব্র গরমের মধ্যে একটি পাটক্ষেতের খোলা আকাশের নিচে দুর্বিষহ দিন ও আতঙ্কের রাত কাটিয়েছেন নারী ও শিশুসহ ১২ জন ভারতীয় নাগরিক। এই জটিল আন্তর্জাতিক সংকটের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ওই ১২ জনের ভাগ্য নির্ধারণে আজ বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের এক জরুরি পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

সীমান্তের এই আকস্মিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জেরে অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে পুরো দৌলতপুর সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

মাথাভাঙ্গা নদী পেরিয়ে বাংলাদেশিদের মানবিকতা

সীমান্ত এলাকার একাধিক সূত্র জানায়, গত শুক্রবার ভোরে প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে ওই ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয় বিএসএফ। পুশইনকৃতদের মধ্যে ৪ জন নারী, ৪ জন পুরুষ এবং ৪টি অবুঝ শিশু রয়েছে, যার মধ্যে একটি শিশুর বয়স মাত্র এক থেকে দেড় বছর। শুক্রবার ভোরে তারা প্রথমে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়লে স্থানীয় গ্রামবাসীরা তাদের দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে খবর দেয়। পরে বিজিবি ও স্থানীয়দের সম্মিলিত তৎপরতায় তাদের সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) ফেরত পাঠানো হয়।

বর্তমানে প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় থাকা একটি ধু ধু পাটক্ষেতের খোলা আকাশের নিচে প্রখর রোদে পুড়ছেন তারা। তীব্র গরমে অবুঝ শিশুদের ছটফটানি দেখে বাংলাদেশিদের মন কেঁদে উঠেছে। অনেক বাংলাদেশি নাগরিক বিজিবির কঠোর নজরদারির মাঝেই মানবিক কারণে খাবার পানি এবং শুকনো খাবার নিয়ে মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিয়ে ওই নিরুপায় মানুষগুলোর পাশে ছুটে গেছেন।

প্রাগপুর সীমান্তে পুশইনকৃতদের বর্তমান পরিস্থিতি:

পুশইনকৃত মোট সংখ্যা লিঙ্গ ও বয়সের অনুপাত বর্তমান অবস্থান ও পরিবেশ বিজিবির বর্তমান পদক্ষেপ
১২ জন (অজ্ঞাত পরিচয়)। ৪ জন নারী, ৪ জন পুরুষ ও ৪টি শিশু (১ জনের বয়স ১.৫ বছর)। প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) পাটক্ষেতের ভেতর। ১৪টি বিওপিতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন ও কঠোর টহল।

বিএসএফের পুশইন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না: বিজিবি

এই চরম উত্তেজনা ও মানবিক সংকটের বিষয়ে বিজিবি-৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, “উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আজ বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আপাতত ওই ১২ জনকে সীমান্তের শূন্যরেখায় আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে থাকতে হচ্ছে।”

অধিনায়ক দৃঢ়তার সাথে স্পষ্ট করে বলেন, “তারা যেন কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য পুরো সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় সীমান্তবাসীও বিজিবিকে স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা করছে। আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক এই ধরণের অবৈধ পুশইন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”

ধু ধু পাটক্ষেতের খোলা আকাশের নিচে প্রখর রোদে পুড়ছেন প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে আসা ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশু।

হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা ও ১৪ বিওপিতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন

এদিকে ভারতের দিক থেকে আরও পুশইনের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সতর্কতামূলক ঘোষণা দিতে দেখা গেছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ ও যেকোনো ধরণের চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম ডাবল করা হয়েছে। বিশেষ করে দৌলতপুর সীমান্তের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি বিওপিতে (বর্ডার আউটপোস্ট) অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করে যুদ্ধংদেহী অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা ও ১৪ বিওপিতে অতিরিক্ত ফোর্স।

সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে উদ্বেগ, পাহারা দিচ্ছেন গ্রামবাসী

অন্যদিকে, বিএসএফের এই পুশইনের চেষ্টার ঘটনায় দৌলতপুরের সীমান্তবর্তী প্রাগপুরসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে ব্যাপক উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরে বসে নেই।

সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিজিবির নির্দেশনা ও সমন্বয় করে তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে রাত-দিন সীমান্তে পাহারা ও নজরদারিতে সহায়তা করছেন। স্থানীয় যুব সমাজ ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য—অন্যায্য ও অবৈধভাবে কোনো ভিনদেশিকে বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পতাকা বৈঠকের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো সীমান্তবাসী।

বিজিবির সাথে পাহারায় এলাকাবাসী

সর্বশেষ নিউজ