দুদকের পরিচালক কাজী সায়েমুজ্জামান প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। প্রেষণে পরিচালক হিসেবে যুক্ত আছেন দুদকে। তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন তা হুবহু নিচে দেয়া হলো।
“নিচের কয়েকটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না৷ এ বিষয়ে আমার নিজের কোন বক্তব্য নেই৷ শুধু ফ্যাক্ট তুলে ধরলাম-
এক. বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশের চেয়ে কম৷ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের পরিচয় লো পেইড ব্যুরোক্রেসি৷ এই দুর্নাম ঘোচাতে ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়ানো হয়৷ তবে এই পরিচয় এখনো অটুট৷
দুই. বাংলাদেশে বেতনক্রমে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা৷ একজন সচিব এই বেতন পান৷ পাশের দেশে একজন সচিবের বেতন কমপক্ষে তাদের মুদ্রায় আড়াই লাখ টাকা৷ অথচ তাদের জীবন যাপনের ব্যয় বাংলাদেশের তিন ভাগের একভাগ৷ আবার মন্ত্রণালয়ের সচিবের অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানের বেতন পাঁচ-সাত লাখ টাকা পর্যন্ত৷
তিন. একজন সচিব মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবদানকারী অফিসার (Principal Accounting Officer)৷ এবার কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কী পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে জেনে নেই৷ অর্থ বিভাগে বরাদ্দের পরিমাণ দুই লাখ ৩১ হাজার ২১১ কোটি টাকা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য এবার দুই হাজার ৪০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। আইন ও বিচার বিভাগে এক হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, জননিরাপত্তা বিভাগে ২৫ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। বাহুল্য হওয়ায় বাকিগুলো বলছি না৷ এখন একজন প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার হিসেবে সচিব স্যারেরা এত টাকা ব্যয় করবেন৷ মাত্র ৭৮ হাজার টাকার বেতনভোগী একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে এত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দপ্রাপ্ত একটি মন্ত্রণালয় পরিচালিত হচ্ছে৷ এ নিয়ে কেউ কথা বলে না৷
চার. বেতন গ্রেডের সর্বশেষ একজন সরকারি চাকরিজীবীর বেতন আট হাজার দুইশ পঞ্চাশ টাকা৷ এখন মাস্টার্স পাস করা লোকও এই গ্রেডে চাকরি করছেন৷ এই বাজারে তাদেরও কিনে খেতে হয়৷ এদের সংসার আছে৷ পরিবার আছে৷ বাবা মা আছে৷ ভাই বোন আছে। অথচ এদের নিয়েও কারো একটা শব্দ লিখতে দেখিনি৷
পাঁচ. সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা বাড়ানো হলে যাদের উপরোক্ত বিষয়ে জানা নেই, তাদের অনেকেই আগপাছ না ভেবে বিরোধিতা করেন৷ বেতন ভাতা জনগণের করের টাকায় দেয়া হয় ৷ তারা বিরোধিতা করতেই পারেন৷ জবাবদিহিতা প্রয়োজন৷ এ বিষয়েও আমার কোন বক্তব্য নেই৷
তবে নিচের দুই শ্রেণির মানুষের জন্য আমার কিছু বক্তব্য রয়েছে৷
এক. এক শ্রেণির সাংবাদিক
সরকার মূল বেতনের ৫ শতাংশ প্রণোদনা হিসেবে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে৷ অথচ এক শ্রেণির সাংবাদিক লিখেছেন সরকার ১০ শতাংশ বেতন বাড়িয়েছেন৷
বাস্তবতা হলো- প্রতিবছর জুলাই মাসে সরকারি চাকরিজীবীর ইনক্রিমেন্ট হিসেবে ৫ শতাংশ বেতন বাড়ে৷ সাংবাদিক মহোদয় এটাকেও বেতন বৃদ্ধির সাথে যোগ করে দিয়েছেন৷ অথচ নিয়মিত যে পাঁচ শতাংশ বাড়ে তা ২০১৫ সালের পে স্কেলে নতুন উদ্ভাবিত সংযোজন৷ এর ফলে সিলেকশন গ্রেড বাদ পড়েছে৷ অনেক সরকারি কর্মচারী দাবি করেছেন যে, সিলেকশন গ্রেড না পেয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্থও হয়েছেন৷ তবে এক বছরে কতজন সিলেকশন গ্রেড পাবেন- তার হিসাব করে বাজেট বরাদ্দ রাখা কষ্টকর৷ এ কারণে বাজেটে শৃঙ্খলা আনতে সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে প্রতি বছর ৫ শতাংশ টাকা দেয়া হয়৷ সিলেকশন গ্রেড সম্পর্কে একটু ধারণা না দিলে পাঠক অতৃপ্ত হবেন৷ সিলেকশন গ্রেড হলো, সরকারি কর্মচারীদের শর্তসাপেক্ষে উচ্চতর স্কেল প্রদান। অর্থাৎ দীর্ঘদিন সন্তোষজনকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তবে পদ না থাকায় পদোন্নতি পাচ্ছেন না-তাদের সিলেকশন গ্রেডের মাধ্যমে আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা হয়। ধরুন, যারা সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার জন্য প্রায় নির্ধারিত সময়ের শেষ লগ্নে ছিলেন, পে স্কেল ঘোষণা হওয়ার কারণে তারা সিলেকশন গ্রেড পাননি৷ যতটুকু জানি এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলাও চলমান৷
কথা হলো, যে শ্রেণির সাংবাদিক ৫ শতাংশ প্রণোদনাকে একটা অধিকারের সাথে মিশিয়ে ১০ শতাংশ হিসাব করে সরকারি চাকরিজীবীরা সব নিয়ে গেল বলে প্রচারণা করছে তাদের আসলে মতলবটা কী! খবর গরম করার জন্য এই মতলববাজি! নাকি কারো প্রপাগান্ডা! নাকি বাজার উস্কে দিচ্ছেন তারা৷ জানার খুব ইচ্ছা আছে৷
দুই. কিছু অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী
সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ প্রণোদনায় একজন কর্মচারীর বেতন বাড়বে পাঁচশ টাকা থেকে তিন হাজার নয়শ টাকা পর্যন্ত৷ একজন কর্মচারী বাড়তি পাঁচশ টাকা নিয়ে বাজারে যাবেন৷ এমন কী কী জিনিস কিনতে পারবেন! অথচ পত্রিকায় দেখলাম সো কলড অর্থনীতিবিদ বলছেন, সরকারি কর্মচারীরা দম পেল৷ কী বলব তাকে৷ সরকার প্রধান দিয়েছেন- এজন্য সবাই মেনে নিয়েছেন৷ তাই বলে পাঁচশ এক হাজার টাকায় সরকারি কর্মচারীর দম এসেছে এটা তাকে কে বলল৷ আর বৃহৎ এই জনসংখ্যায় কিছুসংখ্যক সরকারি চাকরিজীবীর মাসে এই পাঁচশ থেকে চার হাজার টাকা বেশি বাজার করলে দেশের মুদ্রাষ্ফীতি তুঙ্গে উঠে যাবে বলে গলাবাজি করছেন- এর ভিত্তি কী৷ মুদ্রাস্ফীতি যাতে না হয় সে কারণেই তো ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে৷ অথচ মুদ্রাস্ফীতি তো সরকারি হিসেবেই দশ শতাংশ চলছে৷ একজন সাধারণ মানুষও বলে দিতে পারেন, এতে বাজারে প্রভাব পড়ার কোন সুযোগ নেই৷ কোন প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় চার ভাগের একভাগ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় কর্মরতদের দিতে হয়৷ অর্থাৎ একশ টাকায় পঁচিশ টাকা৷ অথচ এবারের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতায় খরচ হচ্ছে একশ টাকায় উনিশ টাকা৷ এটা কোনক্রমেই বেশি নয়৷ আমার প্রশ্ন হলো- এই যে কিছুসংখ্যক তথাকথিত অর্থনীতিবিদদের সরকারি কর্মচারী বিরোধিতা আর আতংক ছড়ানোর প্রচারণায় নামার কারণ কি! তারা যেটা বলতে পারেন, সরকারি কর্মচারীরা সেবাটা যাতে ঠিকমতো দেয় সেটা নিশ্চিত করা দরকার৷ অথচ অবাক হয়ে দেখতে পাচ্ছি, সরকারি কর্মচারীদের ভালো থাকার সূত্রে তাদের লেখা ও কথায় মানসিক বৈকল্য প্রতিফলিত হয়৷ এ কারণেই তারা একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে মাসে আট হাজার ২৫০ টাকায় জীবন যাপন করেন- তা চোখে পড়ে না৷”
(এইদিনএইসময়/২৭জুন/এলএ)

