মতিয়া চৌধুরীর কোনো ব্যাংক ব্যালেঞ্চ নেই

রাশেদ আহমেদ
spot_img
spot_img

অগ্নিকন্যার সাথে কয়েকটা স্মৃতি….

একদিন মগবাজারের ছোট ফ্ল্যাটে গিয়েছি, দেখি ডায়নিং টেবিলে বসে বরবটি বাছছেন, রান্না করার জন্য। আমি তখন একুশে টেলিভিশনে। ওগুলো সরিয়ে রেখে কিছুটা ক্যামেরা উপযোগী ফ্রেম করে সাক্ষাতকার নিলাম। বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসের সাক্ষী এক অগ্নিকন্যার কি সাধারণ জীবন!

১৯৯৬ সালে যখন কৃষিমন্ত্রী তখন শেরপুরের নকলায় তার এক অনুষ্ঠানে আমার অ্যাসাইনমেন্ট। কৃষিমন্ত্রণালয় থেকে দেয়া গাড়ি পথ ভুলে অন্য রাস্তায় চলে গেলো। দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর নকলা ডাকবাংলায় পৌঁছলাম। আমাদের দেখেই অগ্নিকন্যার অগ্নিরূপ। রাস্তাঘাট এখনও চেনো না। আসো খেতে। বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত আমাদের জন্য না খেয়ে বসেছিলেন।

১৯৯৫ সালে আন্দোলনে রাজধানীর ফার্মগেটে নিয়মিত অবস্থান করতেন। সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হলো আইন শৃংখলা বাহিনী। আমিও সেখানে ছিলাম। অগ্নিকন্যা আঁচল কোমড়ে গুঁজে দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন। তার অগ্নিমূর্তি দেখে পুলিশ পিছু হটলো। তখনই বুঝলাম ষাটের দশকে কেনো অগ্নিকন্যা খেতাব হয়েছিল। একদিনতো পুলিশের সাথে ধাক্কা ধাক্কি করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন।

১৯৮৯ সালের দিকে তার একটি দীর্ঘ সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। মতিয়া চৌধুরী যেভাবে অগ্নিকন্যা হলেন। তার ষাটের দশকের একটি ছবি দরকার। স্বামী বজলুর রহমান আলমারি থেকে রাজপথে অগ্নিকন্যার একটি দুর্লভ ছবি বের করে দিলেন। শর্ত ছিলো ছাপা হওয়ার পর মূল ছবিটি যেনো ফেরত দেই। আর ফেরত দেয়া হয়নি। পরে যখন দৈনিক সংবাদে চাকরি করি বজলু ভাইকে এই কথাটি বলেছিলাম। ওটা কি তোমার কাছে এখনও আছে- প্রশ্নের উত্তরে জানালাম নেই, হারিয়ে গেছে। অবশ্য আর কিছু বলেননি তিনি।

সংবাদে বসে বজলু ভাই প্রায়ই মতিয়া চৌধুরীর গল্প করতেন। পাকিস্তান আমলে তাদের বিয়ে হয়। বজলু ভাই পত্রিকার কাজ সেরে রাত দেড়টা/২ টার আগে বাসায় ফিরতে পারতেন না। মতিয়া চৌধুরী না খেয়ে অপেক্ষায় থাকতেন। এভাবে অপেক্ষার দরকার নেই- তুমি ঘুমিয়ে পড়ো- বজলু ভাইয়ের এই অনুরোধ গায়ে নেননি অগ্নিকন্যা।

একটি ফটোগ্রাফ দেখেছিলাম, ষাটের দশকে স্বৈরাচার আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময়কার। পুলিশ ছাত্রনেতাদের পেটাচ্ছে, রাশেদ খান মেননসহ অন্য নেতারা নুইয়ে মাথা গোজার চেষ্টা করছেন। আর অগ্নিকন্যা পুলিশের লাঠি ধরে তা ঠেকিয়ে দিচ্ছেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মন্ত্রী অবস্থায় মতিয়া চৌধুরীকে অনেক সময় দেখেছি সংবাদ অফিসে এসে বজলু ভাইকে বাসায় নিয়ে যেতে।

২০০৭ ও ২০০৮ সালে সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সব দলের অনেক রাজনৈতিক নেতা দৌড়ের ওপর ছিলেন। পালিয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন অনেকে। যারা ছিলেন জেল খেটেছেন। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর টিকিটি ধরতে পারেনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। কারণ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই। তার কোনো ব্যাংক ব্যলেন্স নেই। বিদেশেও টাকা পয়সা নেই। তখনও তিনি সাহস নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিদিন। এখনও তিনি সেই সততা নিয়েই রাজনীতির ভুবন বিচরণ করছেন দাপটের সাথে।

আজ তার ৮১ তম জন্মদিন। শুভ কামনা অগ্নিকন্যা। আরও অনেক দিন বেঁচে থাকুন।

লেখক: সাংবাদিক

সর্বশেষ নিউজ