যতভাবে কোরআন সংরক্ষিত

কাজী সায়েমুজ্জামান
spot_img
spot_img

আমি বেশ কয়েকজন আরবিভাষী সহপাঠী পেয়েছি । তাদের মধ্যে বেশকিছু আবার নাস্তিক। একজনের সাথে কুরআন নিয়ে কথা হয়েছিল। সে আমাকে জানালো, কুরআনে অনেক ভুল আছে। তাকে বললাম, দেখাও কোথায় কোথায় ভুল আছে। সে যা দেখালো তা একবচন বহুবচন সম্পর্কিত। বললো, গণিতেও ভুল আছে। উত্তারাধিকারদের মধ্যে কোরআনের নিয়মে সম্পদ বণ্টন করলে কম বেশি হয় । আমি বললাম, পাগলা, কোরআন মজিদ বুঝতে হলে কোরআনের দৃষ্টিতে দেখার দরকার। ব্যাকরণের সৃষ্টি হয়েছে কোরআনের বহু শত বছর পরে। এ কারণে ব্যাকরণ দিয়ে কোরআনের ভুল ধরা যায় না। আর কোরআনের একবচন বা বহুবচন ব্যবহারের প্রেক্ষাপট কারণ রয়েছে। এগুলো বুঝতে বালাগাত বা অলঙ্কার শাস্ত্র পড়তে হবে। আর উত্তারাধিকার বণ্টনে কোরআন মিলিয়ে দিলে মুসলমানরা গণিত নিয়ে গবেষণা করত না। এর ফলে গবেষণা করতে হয়েছে। এতে আউল আর রাদ ধারণার উদ্ভব হয়েছে।

তাছাড়া কোরআনে বলা হয়েছে, ওয়া ফি আমওলিকুম হক্কুন লিসায়িলি ওয়াল মাহরুম। ‘তোমাদের সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।’

সম্পদ বণ্টন উত্তারাধিকারদের মধ্যে মিলে গেলে এই আয়াত নিয়ে কারো ভাবনা আসত না। বণ্টন করতে গিয়ে বেশি থাকলে রাদ না করেও গরিবদের দিয়ে দিলেই তো হয়। এছাড়াও কোরআনের মতো একটি আয়াত বানিয়ে দেখানোর যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে এটাও সে মানতে নারাজ। সে বলেছে, কিছুদিন আগে করোনার সময় তিউনিশিয়ার একজন করোনা নিয়ে একটা সুরা বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে। এতে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। এ কারণে সবাই এটি এড়িয়ে চলে। আমি তাকে বললাম, কুরআনের ইউনিকনেস হলো, এর পাঠ পদ্ধতি- তেলাওয়াত। তাকে এটাও বললাম, আমাকে সাড়ে ১৪শ বছর আগের বাংলা পড়ে শুনানো হলে, আমি কিছুই বুঝব না। অক্ষরও চিনব না। কত বিবর্তন হয়েছে। অথচ কোরআনের আরবি ঠিক এত সময় পরেও স্টান্ডার্ড আরবি। কোন আরবি ভাষাভাষীর বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না। কোরআনের ভাষা বুঝলে সে বর্তমান সময়ে আরবিতে লেখা যেকোন বই বুঝতে পারবে৷

যাই হোক, কোরআনের বিরোধীতাকারীদের জবাব দিতে এ বিষয়ে কথা বলার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো- এটা জানানো যে, আরবিভাষীদের মধ্যেও নাস্তিকতা বাড়ছে। এরা আধুনিক শিক্ষিত। তাদের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম, ইসলাম নামধারী একটি অংশের উগ্রতা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হানাহানির পেছনের কারণ বলে তারা মনে করছে। কেউ এই দুর্ভোগ ও মৃত্যুর জন্য ইসলামকেই সরাসরি দায়ী করছে। ফলত তারা ধর্ম ছাড়ছে। বর্তমান বিশ্বে অনেকে যেমন মুসলমান হচ্ছেন, আবার অনেকে ইসলাম ধর্মও ত্যাগ করছেন। ইসলামত্যাগী বিখ্যাত মানুষের তালিকা উইকিপিডিয়াতেও আছে। এদের কেউ উগ্র নাস্তিকও হচ্ছে। সম্প্রতি ইরাকের একজন সুইডেন প্রবাসী কোরআন অবমাননা করেছে। সে আরবিভাষী উগ্রপন্থী নাস্তিকদেরই একজন।

এখন প্রশ্ন হলো- কোরআন পোড়ানো যায় কী না? এ বিষয়ে আলোচনা করা যাক। কোরআনের ১০৬টি আয়াতে কোরআন সম্পর্কে বলা হয়েছে। একটি আয়াতে বলা হয়েছে, কোরআন মজিদ আল্লাহ নাজিল করেছেন। আর আল্লাহই এই কোরআন সংরক্ষণ করবেন। এ কারণে কোরআনকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এর বড় প্রমাণ হলো- বর্তমানে বিশ্বে প্রায় সাড়ে ছয় কোটির বেশি কোরআনের হাফেজ রয়েছে। একদল মনে করে, কোরআন ছাপানো পুস্তক পুড়িয়ে দিলে বা ছিঁড়ে ফেললেই তা ধ্বংস হয়ে যাবে। এরা পুরাপুরি বোকার স্বর্গে বাস করে। আবার একদল মনে করে, কাগজে লেখা যে কোরআন তা আগুনে পুড়ে না। এদেরও কোরআন সম্পর্কে সাধারণ ধারণার অভাব রয়েছে। এ কারণেই কোথাও অগ্নিকান্ডের পর প্রায়শই দেখা যায়- কোরআন পুড়েনি বলে প্রচার করা হচ্ছে৷ আর তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ৷ তো কোরআনের বই না পুড়লে সুইডেনে পুড়াল কীভাবে?

শেষের এই শ্রেণির মানুষের যে বিষয়টা জানা দরকার তা হলো- কোরআন হচ্ছে- শব্দ (লফজ) ও অর্থ (মানাআ) দুটার সমন্বয়। যখন এটা পড়া হয়- তখনই এটা কোরআন। আর কোরআনের শাব্দিক অর্থও পঠিত। মাদরাসায় হেদায়া নামে একটি বই পড়ানো হয়। সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। প্রশ্ন করা হয়েছে- হালিল কুরআনু লফজান আও মাআনান? কোরআন কী শব্দের নাকি অর্থের? এ বিষয়ে ইমামদের সধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা রা. এক সময় মনে করতেন অর্থটাই কোরআন। কারণ কোরআনে বলা হয়েছে, ওয়া ইন্নাহু লা ফি ঝুবুরিল আউয়ালিন- কোরআন পূর্ববর্তী কিতাবেও রয়েছে। (সুরা শুআরা: আয়াত ১৯৬) অথচ পূর্ববর্তী কিতাবগুলো আরবিতে লিখিত ছিল না। একারণে ইমাম আবু হানীফা রা. ফারসিতে কোরআন পড়া যাবে বলে মত দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হানাফী স্কুল অব থটের ইমাম হযরত আবু ইউসুফ রা. ও ইমাম মুহাম্মদ রা. বলেছিলেন, নামজে আরবিতেই কুরআন পড়তে হবে। শেষ বয়সে ইমাম আবু হানীফা রা. অবশ্য এটা মেনে নিয়েছিলেন। সবশেষ কথা হলো- হানাফী মাজহাবের মতে, কোরআন হলো শব্দ ও তার অর্থের সমন্বয়। কোরআন শুধু শব্দ নয়। শুধু অর্থও কোরআন নয়। তাহলে অর্থ না বুঝে শুধু কোরআন পড়লে কী সওয়াব হবে না? এই বিষয়টা স্পষ্ট করতে চাই। সেটা হলো- কোরআন বুঝে পড়ুক বা না বুঝে পড়ুক সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে বুঝতেই পেরেছেন, অর্থসহ পড়াটাই ভালো।

সবশেষে বলা যায়, কাগজে লেখা যেকোন কিছু আগুনে পুড়বে। তাতে কোরআনের কিছু লেখা থাকলে তাও পুড়বে। তবে কাগজে লেখা কোরআনের শব্দগুলো একটি দৃশ্যমান অংশ। আরেকটি অদৃশ্য বিষয় হচ্ছে- অর্থ। আল্লাহ যা বলেছেন। যখনই পড়া হবে-এই দুটি বিষয় একত্রিত হয়ে কোরআন হবে। এটা পোড়ানো সম্ভব নয়। কেউ কোরআন বইটি পুড়ে ফেললে সেটা কোরআনের অবমাননা হবে নিশ্চয়ই। তবে সে কোরআন পুড়িয়ে দিয়েছে- এমনটা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এটা আবার অদৃশ্য শব্দে বুকেও ধারণ করা যায়। একজন হাফেজ হয়তো মেরে ফেলা যাবে৷ সাড়ে ছয় কোটি কোরআনের হাফেজের বুক থেকে কোরআন ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ভাবতে অবাক লাগে, কোরআন কতভাবে সংরক্ষিত৷ লওহে মাহফুজে৷ কাগজে৷ পাথরে৷ সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো- অনুসারীদের বুকের ভেতরে৷

কোরআন হলো নুর। এ নুর নির্বাপিত করা সম্ভব নয়।

লেখক: পরিচালক, দুদক

সর্বশেষ নিউজ