মুশফিকুল ফজল আনসারী
মাস হতে চললো স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছে মুক্তির আনন্দ। এরপরও এক গণহত্যাকারী ও তার এস্টাব্লিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসসহ দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে। এই লড়াইয়ে একদিকে গণতন্ত্রের পক্ষ এবং অন্যদিকে গণহত্যাকারী ও তাদের দোসর। রাষ্ট্রযন্ত্রের বাঁকে বাঁকে ঢুকে পড়া সুবিধাভোগিরা ফ্যাসিবাদের বিষবাস্প ছড়াচ্ছে নানা কায়দায়।
আমি আশাবাদী, কারণ বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের তারুণ্য সারা পৃথিবীতে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জেনারেশন জি থেকে প্রথমবারের মত কোনো দেশে মন্ত্রিত্বের মর্যাদায় আসীন হয়েছে। আমাদের সমস্যা প্রবল; সম্ভাবনাও বিস্তর।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে আমার অবস্থান আপনাদের জানা। ফ্যাসিস্ট সরকারের পলায়নের মধ্য দিয়ে কোটি মানুষ যে মুক্তি উদযাপন করছে, আমিও তাদেরই একজন। আমার যেসব সহকর্মী, সতীর্থ, বন্ধুরা মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে পেরেছেন, তাঁদের আনন্দে আমিও আনন্দিত।
আজ প্রায় দুই মাসের ব্যবধানে একটু পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি। কিছু এলোমেলো ভাবনাও কাজ করছে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবার কারণে প্রায় ১০ বছর দেশে ফিরতে পারিনি। আপনারা যারা অবর্ণনীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; তাঁদের অপরীসিম ত্যাগের কাছে আমি নিতান্তই তুচ্ছ। ফ্যাসিবাদী সরকার আমার রাষ্ট্রীয় পরিচয় টুকু কেড়ে নিতে চেয়েছে। একটা সময় গেছে যখন আমাকে ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে চলাফেরা করতে হয়েছে। যাদের কোনো রাষ্ট্র নেই, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই যখন তাঁদের ঠিকানা নয়; তখন এরকম মানুষদের আবেদনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী স্বাগতিক দেশ একটি ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে থাকে। এই ট্র্যাভেল ডকুমেন্টটি প্রধানত শরনার্থীদের জন্য। এই বিষয়টি আমাকে দীর্ঘ সময় ভাবিয়েছে।
এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছি আমার সহকর্মী ও শুভান্যুধায়্যীদের সাথে। শান্তিকামী মানুষদের অপরিসীম চেস্টার পরও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ সংঘাত থামছে না। জাতিসংঘের হিসেব মতে এই সময়ে প্রায় ৮০ মিলিয়ন বা আট কোটির বেশি মানুষ যুদ্ধ বিধ্বস্ত; নিজের জন্মভুমি থেকে বিতাড়িত, শরনার্থী। এদের বেশিরভাগ শিশু, কিশোর। এদের বেঁচে থাকাটাই সব; স্বপ্নেরা নেই। আবার এসব শরনার্থী শিবিরের কারো কারো তিন পুরুষ জীবন পার হয়ে গেছে। এসব মানুষের জীবনে কবে আনন্দের অশ্রু আসবে, যেন কেউ জানে না।
বাংলাদেশে অনেকেই আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁদের জীবদ্দশায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন দেখে যেতে পারবেন কিনা। আমি একদিনও আশা ছাড়িনি; আমার কাছের অনেক বন্ধুও আমার কাজকে স্রেফ পাগলামি বলে নিজের কাজে মন দিয়েছেন। হুমকি এবং প্রলোভনকে উপেক্ষা করে আমি আমার সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা করেছি। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবার পর বন্ধুরা যখন বলেছেন, বিশ্বসভায় বাংলাদেশের মানুষের প্রতি নির্যাতন আর গুম-খুনের ঘটনা বিরামহীন ভাবে তুলে ধরায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে; তখন আশাবাদী হই আবার দ্বিধায়ও পড়ি। তবে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্টের পতনের পর নিজের ক্ষুদ্র সক্ষমতা নিয়ে এখন যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব শরণার্থী মানুষের জন্য কিছু একটা করার তাড়না অনুভব করি। ঠিক যেমন বাংলাদেশের জন্য কণ্ঠকে প্রসারিত করেছিলাম; তার চেয়েও ঢের বেশি।
লেখক: আমেরিকা প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।

