দেশের রাজনীতিতে ঘুর্ণি বায়ু অনুভুত হচ্ছে। জন আকাঙ্খার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ থেকে সরে যাচ্ছে রাজনীতি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ রাজনীতিকরা যেন আবারো প্রমাণ করতে চলেছেন জনগণের সাথে প্রতারনাই হচ্ছে রাজনীতির মুল উপজীব্য। দুর্বিসহ জীবন যাপন, অসহনীয় নিপীড়ন মোকাবেলা আর গণ মানুষের বার বার রক্ত দানের বিনিময়ে ক্ষমতা ভোগ করা যেন রাজনীতিকদের অধিকার। ”রাষ্টের মালিক জনগণ” আর ”জনগণই ক্ষমতার উৎস”এসব ¯ে¬াগান দিয়ে জনগণকে ব্যবহার করে বিশেষ গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ার নামই যেন রাজনীতি। দেশে চলমান ক্ষমতা দখলের এ রাজনীতি রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ তাদের ভাগ্য বদল বা অধিকার নিশ্চিত করতে পারছেনা। বিষয়টা একটু পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশ বেনিয়াদের বাংলা দখলের পর দুইশত বছর আমরা পরাধীন জীবন যাপন করেছি। ’৪৭ এর স্বাধীনতার পরে ২৩ বছরের শাসনামলকে আমরা বলেছি বিদেশী শাসন শোষণ। কিন্তু ’৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তারপরে তো এদেশের জনগণ স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ পাওয়ার কথা ছিল। স্বদেশী এ শাসন কি জনগণের অধিকার করেছে? স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও জনগণ শোষণের যাঁতাকল থেকে মুক্তির কোন পথরেখা দেখছেনা। ২০২৪ এর জুলাই বিপ¬বে জনগণ মুক্তির যে স্ফ‚লিঙ্গ দেখতে পেয়েছিল তা গতানুগতিক রাজনীতির কবলে পড়ে বলিদান হতে চলেছে। বিগত নির্বাচনে যে বিএনপির উপর জনগণ নিরংকুশ আস্থা রেখেছিল, তারা আজ জনগণের সামনে নিজেদেরকে প্রতারণার রাজনীতির ধারক বাহক হিসেবে উপস্থাপন করছে। নিজেরাই বলছে নির্বাচন আদায়ের জন্যই তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন আজ উত্তপ্ত। ক্ষোভে ফু ঁসছে সারাদেশ। শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্রই এ নিয়েই রাজনীতির ঘুর্ণি বায়ু পাকছে। গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর এ দ্বিচারিতা এবং ক্ষমতা লিপ্সায় দিকভ্রান্ত হওয়া নতুন কিছু নয়। ক্ষমতা দখলের জন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো যে কোন শর্ত মেনে নিতে সব সময় প্রস্তুত থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় বসে আর তা বাস্তবায়ন করেনা। তাহলে কি রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যই থাকে রাষ্ট্রে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা নয়, বরং যে কোনভাবে ক্ষমতা দখল করে জনগণকে শোষণ কর্।া যেমন আমরা দেখেছি ১৯৯১ এ ক্ষমতায় বসে তিন জোটের প্রতিশ্র“ত রুপরেখা বাস্তবায়ন করেনি বিএনপি। ১৯৯৬ এ ক্ষমতায় বসে জনজীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছিল আওয়ামীলীগ। ২০০১ সালের জোট সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার বদলে মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে পা বাড়িয়ে দেশকে আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদী শক্তির কবলে নিপতিত করেছিল। জনস্বার্থ চিন্তা না করে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা দখলে বেপরোয়া গতিতে ছুটতে গিয়ে যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ২০০৮ সালে তেমনটিই লক্ষ্য করা গেছে। সেই নির্বাচনে যদি বিএনপি ও জামায়াত তাৎক্ষণিক সায় না দিত তাহলে এদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো। বাংলাদেশ হয়তো সাড়ে পনের বছরের দুঃশাসনে আর বিদেশী দখলদারিত্বের কবলে পড়তে হতোনা। আমরা দেখতে পাই বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। তারা সব সময় অদৃশ্য সুতার টানে পরিচালিত হয়। আর সেই সুতার নাটাই থাকে বিশ্ব মোড়লদের হাতে। জনগণের আর্শীর্বাদের আশা না করে রাজনৈতিক দলগুলো দৌড়ায় বিশ্ব মোড়লদের আশীর্বাদের পেছনে। তাই আমরা দেখতে পাই ২০১৪ সালে জনগণ যখন চেয়েছিল ভোটের মাধ্যমে দখলদারদের উৎখাত করতে, তখন বিএনপিজামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এরাই ২০১৮ সালে হাসিনার নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ডঃ কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেয়। আর ২০২৪ সালে বসে বসে নির্বাচনী তামাশা উপভোগ করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারীতে বিদেশী মদদপুষ্ট ফ্যাসিস্ট শক্তির নির্বাচনী মহড়া উপভোগের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়ে গেছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেনা। মুলত ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা ছাত্র নেতৃত্ব জাতিকে নতুন পথ দেখায়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এর ৫ আগষ্টের ছাত্র গণবিপ্লব এদেশের জনগণের মাঝে নতুন আকাংখার জন্ম দেয়। শত ত্রæটি এবং বিতর্কিত বিষয়গুলো বাদ দিলেও বিপ্লব পরবর্তী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়, যা গণভোটে উত্তীর্ণ হয়। জনগন বাংলাদেশকে ন্যূনতম যেভাবে দেখতে চায় তার পক্ষেই জনগণ রায় দেয়। কিন্তু ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা দখলকারীরা এখন জনরায় আর মানছেনা। আমরা দেখছি ক্ষমতাসীনরা গণরায় পুরোপুরো বাতিল করে দিয়েছে। আর বিরোধী পক্ষ এ নিয়ে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো- এখন কেন এ হুমকি? তড়িঘড়ি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আগেই যদি গণভোট অনুষ্ঠান এবং সে আলোকে নির্বাচন করা হতো তাহলেতো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতোনা। দেশ এবং জনগণের জন্য কোন রাজনৈতিক দলেরই দায়িত্বশীলতা আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। ২০০৮ সালে নির্বাচন যেমন দেশ দখলে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ ছিল, ২০২৬ সালের নির্বাচনও তাই ছিল। বলা যায় নাটকের পাত্রপাত্রী পাল্টেছে। তবে এবার দেশের ছাত্র জনতা শিখে গেছে ক্ষমতা থেকে কিভাবে জগদ্দল পাথর সরাতে হয়। তাই নীল নকশার নির্বাচনের বিষয়টি যেহেতু সরকারী দলের মুখ থেকে ফাঁস হয়ে গেছে, এবার দেশের মালিক জনগণকে দেশ পরিচালনায় নতুন কিছু ভাবতে হবে। তবে ২০২৪ এ ছিল জনগণের উপর চেপে বসা পাথর সরানোর বিপ্লব, আর এবার হতে পারে জনগণের ক্ষমতায়নের বিপ্লব। জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজনীতিতে যে ঘুর্ণি বায়ু দেখা যাচ্ছে তাই তরুণ সমাজের কাছে আরেকটি বিপ্লবকে অনিবার্য করে তুলতে পারে। কারণ জনগণ ক্ষমতার পালাবদল চায়না। চায় রাষ্ট্রের মালিক জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার রাজনীতি। অর্থাৎ যে শ্লোগান তারা ২৪ এ দিয়েছিল “দেশটা কারো বাপের না, ক্ষমতা হবে জনতার” এটিই হোক আগামীর রাজনীতি। আমরা রাজার নীতি চাইনা, চাই রাজনীতি হোক জননীতি।
রাজনীতিতে ঘুর্ণি বায়ু
সম্পাদক: আহমেদ করিম

