ভাটিয়ারীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মা-শিশুর মৃত্যু: সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে চাকায় পিষ্ট হলেন সরকারি কর্মকর্তা মা

জহিরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
spot_img
spot_img

সপ্তাহজুড়ে কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিনে পরিবারের সঙ্গে একটু আনন্দঘন সময় কাটাতে বের হয়েছিলেন এক মা। কোলে ছিল আদরের দুধের শিশু, চোখে ছিল সুখের এক ছোট্ট সংসার। কিন্তু এক মুহূর্তের এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে সেই স্বপ্ন চিরতরে থমকে গেল। চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাওয়া সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে পেছন থেকে আসা দ্রুতগতির গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন মা ও তাঁর ২২ মাস বয়সী কন্যাসন্তান। গতকাল শুক্রবার (১৫ মে ২০২৬) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী বিএমএ গেইট এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এই বর্বরোচিত দুর্ঘটনা ঘটে। ভাটিয়ারীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মা-শিশুর মৃত্যু-র এই ঘটনা পুরো চট্টগ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

চলন্ত মোটোরসাইকেল থেকে শিশু ছিটকে পড়া ও মায়ের আত্মত্যাগ

নিহত মায়ের নাম তারিন আক্তার। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম জাকারিয়া হোসেন নয়ন এবং তাঁদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তারিন আক্তার তাঁর স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে মোটরসাইকেলযোগে ভাটিয়ারীর মনোরম পরিবেশে ঘুরতে এসেছিলেন। দিনভর আনন্দ কাটিয়ে রাতের দিকে তাঁরা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন। পথে ভাটিয়ারী বিএমএ গেইট এলাকায় পৌঁছালে অসাবধানতাবশত চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে মহাসড়কে পড়ে যায় তাঁদের ২২ মাস বয়সী শিশু কন্যা ইয়াশা। চোখের সামনে সন্তানের এমন বিপদ দেখে মাতৃত্বের টানে নিজের জীবনের কথা ভুলে যান মা। ইয়াশাকে বুকে তুলে নিতে তিনি দ্রুত ছুটে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগতির অজ্ঞাত গাড়ি মা ও শিশুকে একসঙ্গে চাপা দেয়।

চমেক মর্গে পাশাপাশি দুই নিথর দেহ

দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে মা-শিশুকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পথচারী ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তারিন আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ছোট্ট শিশু ইয়াশাও। বর্তমানে মা ও শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। মর্গে পাশাপাশি পড়ে থাকা মা ও শিশুর নিথর দেহের দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা, ভারী হয়ে ওঠে চমেকের বাতাস।

হাইওয়ে পুলিশের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া

বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হক দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ভাটিয়ারী বিএমএ গেইট এলাকায় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার পর একটি গাড়ি তাদের চাপা দেয়। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালেও কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ঘাতক গাড়িটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনারও (ভূমি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের কাছ থেকে দুর্ঘটনার বিবরণ শুনেছেন।

প্রশাসনে শোকের ছায়া

সরকারি কর্মকর্তা তারিন আক্তারের এমন অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় এবং সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। সহকর্মীরা জানান, তারিন আক্তার অত্যন্ত দায়িত্বশীল, কর্মনিষ্ঠ ও আন্তরিক একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর এমন বিদায় প্রশাসনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভাটিয়ারীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মা-শিশুর মৃত্যু যেন আরও একবার প্রমাণ করল—সন্তানের সুরক্ষায় মায়ের ভালোবাসার কাছে নিজের জীবনের মূল্য কতটা তুচ্ছ।

সর্বশেষ নিউজ