কোরবানির ঈদ ঘিরে ভারতীয় গরু চোরাচালান বন্ধের দাবি খামারিদের: লোকসানের শঙ্কায় সীমান্ত জেলাগুলো, বিজিবির কড়া অবস্থান

ন্যাশনাল ডেস্ক
spot_img
spot_img

দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। বছরজুড়ে লালন-পালন করা ছোট-বড় গরু গাড়িভর্তি করে পশুর হাটে নিয়ে ছুটছেন দেশের প্রান্তিক খামারিরা। তবে গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক দাম ও লালন-পালন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এমনিতেই পশুর কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে খামারিদের। এর ওপর সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দিয়ে অবৈধ পথে ভারতীয় গরু অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় খামারিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। দেশের ডেইরি শিল্পকে বাঁচাতে এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে অবিলম্বে ভারতীয় গরু চোরাচালান বন্ধের দাবি তুলেছেন সাধারণ খামারি ও বিক্রেতারা।

সাতমাইল পশুর হাটে ক্রেতা সংকট ও খামারিদের ক্ষোভ

কোরবানির আমেজ শুরু হতেই দুপুরের পরপরই জমজমাট হয়ে উঠছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট যশোরের ‘সাতমাইল হাট’। তবে হাটে পশুর পর্যাপ্ত আমদানি থাকলেও ক্রেতা সংকটে হতাশ বিক্রেতারা। হাটে আসা কয়েকজন গরু বিক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “যে গরুর উৎপাদন খরচ ও বাজার মূল্য অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, হাটে পাইকার ও কাস্টমাররা সেটির দাম বলছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। বাজারে দেশি গরুর সঠিক ক্রেতা নেই। এত কম দামে গরু ছাড়লে আমাদের প্রতিটা গরুতে বিশাল লোকসান হয়ে যাবে।” খামারিদের শঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু ঢুকলে দেশি গরুর বাজার পুরোপুরি ধসে পড়বে।

লালমনিরহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে চোরাকারবারীদের দাপট

সীমান্তবর্তী আরেক জেলা লালমনিরহাটে প্রায় ১৯ হাজার খামারি রয়েছেন। ঈদকে সামনে রেখে এই জেলায় গরু চোরাকারবারীদের দাপট বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিদের দুশ্চিন্তা কিছুতেই কাটছে না। স্থানীয় এক খামারি বলেন, “ভারত থেকে চোরাই পথে গরু না আসলে আমরা খামারিরা একটু স্বাবলম্বী হতে পারব। ওরা ওপার থেকে একদিনের জন্য সস্তায় গরু ছেড়ে দেয়, আর আমরা দেশি খামারিরা সারা বছর ধরে ধার-দেনা করে গরু পালি। বাজারে ভারতীয় গরু ঢুকলে আমাদের পথে বসতে হবে।”

একই চিত্র দেখা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জেও। এখানকার খামারিদের অভিযোগ, প্রতিবার কোরবানির মোক্ষম সময়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু দেশের হাটে উঠে পড়ে। ফলে স্থানীয় খামারিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। তাদের দাবি, বাংলাদেশে যদি ভারত বা অন্য কোনো দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে কোনো পশু না ঢুকে, তবে এবার দেশি খামারিরা কিছুটা হলেও লাভবান হতে পারবেন।

সীমান্তে বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর অবস্থান

খামারিদের এমন চরম বাস্তবতার মুখে ভারতীয় গবাদিপশুর অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা কয়েকগুণ বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বৈধ কিংবা অবৈধ—সব পথেই গবাদিপশু পারাপার বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

লালমনিরহাট ১৫-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মেহদি ইমাম খামারিদের আশ্বস্ত করে বলেন, “দেশি খামারিদের পশুর বাজার যেন কোনোভাবেই অস্থিতিশীল না হয়, সে লক্ষ্যে বিজিবি গতবারের মতোই সর্বোচ্চ কর্মতৎপর থাকবে। সীমান্তে আমাদের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা তৎপরতা সচল রয়েছে। আমরা স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং চোরাচালান সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তা দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করা হবে।”

সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার দাবি সংশ্লিষ্টদের

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের মতে, কোরবানির ঈদে দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি দেশি গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে। খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সীমান্ত পাহারা জোরদারের পাশাপাশি পশুর হাটগুলোতে কৃত্রিম সংকট ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে একটি সুষ্ঠু ও সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ নিউজ