রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ইতিহাসে এবার অন্যতম বৃহত্তম ও নজিরবিহীন ড্রোন হামলার সাক্ষী হলো ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোসহ অন্তত ১৪টি অঞ্চলে একযোগে প্রায় ৬০০ ড্রোন নিয়ে ঝটিকা হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী। ইউক্রেনের এই সর্বাত্মক ও বর্বরোচিত হামলায় এক ভারতীয় নাগরিকসহ অন্তত ৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। আজ রোববার (১৭ মে ২০২৬) রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক গভর্নরদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মস্কো ও আশপাশে ইউক্রেনের বিশাল হামলা: ৬০০ ড্রোনের তাণ্ডব
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, গত শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু করে রোববার ভোর পর্যন্ত রাশিয়ার ১৪টি প্রধান অঞ্চল, ক্রিমিয়া উপদ্বীপ এবং কৃষ্ণ ও আজভ সাগরের বিস্তীর্ণ আকাশসীমায় প্রায় ৬০০ আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালায় ইউক্রেন। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ও এর পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো।
রাশিয়ার শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) রাতভর আকাশেই ৫৫৬টি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয় এবং ভোরের দিকে জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও ৩০টি ড্রোন নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করে। তবে বিপুল সংখ্যক ড্রোনের এই ঝাঁক রুখতে গিয়ে খোদ রাজধানীতেই চরম আতঙ্ক ও যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়।
খিমকি ও পোগোরেলকিতে ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি
মস্কোর আঞ্চলিক গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ এই আক্রমণকে ওই অঞ্চলের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে ‘ব্যাপক ও ভয়াবহ’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, মস্কোর উত্তরের খিমকি এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইউক্রেনীয় ড্রোন সরাসরি আঘাত হানলে এক নারী নিহত হন। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ অন্য একজনের সন্ধান করছেন।
এছাড়া মস্কো থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত পোগোরেলকি গ্রামে একটি নির্মাণাধীন স্থানে ড্রোনের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ এসে পড়লে আরও দুই ব্যক্তি নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন ভারতীয় নির্মাণ শ্রমিক বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। হামলায় ওই এলাকার বেশ কিছু বহুতল আবাসিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুবিধা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তেল শোধনাগার ও শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে আতঙ্ক
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে জানান, খোদ মস্কো শহরের ভেতরেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতভর ৮০টিরও বেশি ড্রোন ধ্বংস করেছে। ড্রোনের খণ্ডাংশ ও ধ্বংসাবশেষ মাটিতে আছড়ে পড়ে অন্তত ১২ জন সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন। মস্কোর একটি প্রধান তেল শোধনাগারের কাছে নির্মাণ শ্রমিকদের ওপর ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়লেও শোধনাগারটির উৎপাদন ব্যাহত হয়নি এবং এর কারিগরি কার্যক্রম নিরাপদ রয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—’শেরেমেতিয়েভো’ জানিয়েছে, তাদের রানওয়ে ও সীমানার ভেতরে ড্রোনের জ্বলন্ত টুকরো আছড়ে পড়লেও বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা ফ্লাইট চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়নি। সাধারণত ইউক্রেন সীমান্ত থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মস্কো শহর এতটা বড় মাত্রার হামলার মুখে পড়ে না, ফলে এই হামলা ক্রেমলিনের নিরাপত্তা বলয়কে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এছাড়া সীমান্তবর্তী বেলগোরোড অঞ্চলে একটি ট্রাকে ড্রোন হামলায় আরও এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
জেলেনস্কির প্রতিশোধের হুঁশিয়ারির বাস্তব রূপ
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহে ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার তিন দিনব্যাপী চালানো প্রলয়ঙ্কারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২০ জনেরও বেশি ইউক্রেনীয় নাগরিক নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছিলেন। সেই হামলার পরপরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ক্রেমলিনকে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। রোববারের এই মস্কো ও আশপাশে ইউক্রেনের বিশাল হামলা মূলত জেলেনস্কির সেই হুঁশিয়ারিরই বাস্তব ও বিধ্বংসী প্রতিফলন। এই নজিরবিহীন ড্রোন হামলা দক্ষিণ ইউরোপ ও রাশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে আরও বেশি রক্তক্ষয়ী ও অনিশ্চিত করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

