সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করায় হাইকোর্টের বিস্ময় প্রকাশ

সবুজ সিদ্দিকী
spot_img
spot_img

সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত এক রায়ে বাংলাদেশের জনগণের অর্ধশতাব্দীকালের স্বপ্ন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছিল। আর সে স্বপ্ন কার্যকর করেছিল জুলাই বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে দেশের দায়িত্ব নেয়া ডঃ ইউনুস সরকার। সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের আলোকে প্রজ্ঞাপন জারি করে তা বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল অন্তবর্তী সরকার। বর্তমান সরকার প্রথমত জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অধ্যাদেশটি বাতিল করে দেয়। গত মঙ্গলবার ১৯ মে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতির আদেশে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা হলো। এর মধ্য দিয়ে যাদের কাছে জনগণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আশা করেছিল কার্যত তারাই এ স্বাধীনতা হত্যা করল। এ নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ থাকলেও কোনো উচ্চবাচ্য নেই আদালত ও আইন অঙ্গনে। আইনজীবীরা দলবাজিতে এমন নিমগ্ন যে স্বাধীনতা শব্দটাই তারা যেন ভুলে গেছে। কোথায় এখন মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা—সে প্রশ্ন জনগণের মুখে মুখে।

গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করায় বিচার ও বিচারক সংক্রান্ত কার্যক্রম স্বাধীনভাবে চলার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল সরকার সংসদে বিল পাশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রজ্ঞাপনটি বিলুপ্ত করে। বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জনবলকে গত বুধবার ১৯ মে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়।

ইতিহাসের পাতায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার লড়াই 

বাংলাদেশের সংবিধানে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে শাসন বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আইন বিভাগ বা জাতীয় সংসদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগ সব সময় স্বাধীন। সংবিধান এবং আইনের ব্যাখ্যাও দিয়ে থাকে বিচার বিভাগ। কিন্তু এদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই বিচার বিভাগকে আইন ও শাসন বিভাগের অধীন করার অপচেষ্টা অব্যাহত ছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গগুলো থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। সংবিধানে এ নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী দুই দশকেও বিচার বিভাগকে executive বা নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায় ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে বিচারপতি মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ তথা তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিলের শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক রায় দেয়। এতে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখা, এবং নিম্ন আদালতের বাজেট প্রণয়ণে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে ২০০১ সালে ক্ষমাতাসীন চারদলীয় জোট সরকার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন তত্ত্ববধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা দেয়। তবে এ ঘোষণা নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল।

জুলাই গণবিপ্লব ও প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তথা জুলাই গণবিপ্লবের পর দেশের ২৫ তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ২১ সেপ্টেম্বর এক অভিভাষণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মাসদার হোসেন মামলার রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ (ক) অনুচ্ছেদে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা থাকলেও আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বিলোপ এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর পৃথক সচিবালয় প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সময়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিতের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে এক রিট মামলায় উচ্চ আদালত ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বরের রায়ে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। সেই রায়ের প্রেক্ষিতে ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে। অধ্যাদেশ জারির পরদিন রেজিস্টার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সচিব করা হয় এবং সচিবালয়ের কাঠামো নির্ধারণে কমিটি গঠন করা হয়। এ ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সচিবালয়ের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

উচ্চ আদালতের তীব্র বিস্ময় ও অবমাননার আবেদন

এদিকে গতকাল বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের বেঞ্চে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হলে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের কাছে জানতে চান, ‘এটি কীভাবে সম্ভব?’

পরে রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির জানান, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করায় হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ পদক্ষেপ আদালত অবমাননার শামিল। তিনি আরো জানান, আজ বৃহস্পতিবার সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করা হবে এবং আবেদনটি তিনি নিজেই করবেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারপন্থী কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আইন অঙ্গন ও রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র উদ্বেগ

সচিবালয় বিলুপ্তির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সাবেক সহকারী সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সাইফুর রহমান বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসহ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রজ্ঞাপন তথা জন্মের সাথে যিনি যুক্ত ছিলেন, তিনিই আজ আইনমন্ত্রী হয়ে এ বিভাগের স্বাধীনতা হত্যার সাথে যুক্ত হলেন। এদেশের জনগণ এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। অচিরেই এর প্রত্যুত্তর পাবে সরকার।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড কনক বড়ুয়া এক বিবৃতিতে বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপিল বিভাগে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সচিবালয় বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।” তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সর্বশেষ নিউজ