মাদ্রাসার সুপারের ছেলের জন্য জালিয়াতি! কুষ্টিয়ায় কেন্দ্রের বাইরে খাতা লেখার সময় পরীক্ষার্থী বহিষ্কার আটক ৩ শিক্ষক

ইয়াসমিন খন্দকার, কুষ্টিয়া
spot_img
spot_img

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় দাখিল (এসএসসি সমমান) পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে পরীক্ষার মূল খাতা নিয়ে উত্তর লিখে দেওয়ার মতো এক দুঃসাহসিক ও নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। এই অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত এক পরীক্ষার্থীকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সাথে জালিয়াতির মূল হোতা ও হাতেনাতে ধরা পড়া ৩ জন শিক্ষককে আটক করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

গতকাল বুধবার (২০ মে ২০২৬) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের চুয়ামল্লিকপাড়া রেজওয়ানুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা পরীক্ষা কেন্দ্রে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর নাম মো. নাসিরুল্লাহ (১৬)। সে মহিষকুন্ডি মুসলিমনগর দাখিল মাদ্রাসার নিয়মিত ছাত্র এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী ওই মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট (প্রধান শিক্ষক) মো. আব্দুল ওহাব বিশ্বাসের ছেলে।

সুপারের ছেলের খাতা লিখছিলেন নিজস্ব শিক্ষকেরা!

আটক হওয়া ৩ শিক্ষক হলেন—মো. বজলুর রহমান (৪৮), মো. নুরুল ইসলাম (৪৫) এবং মোছা. মাতোয়ারা খাতুন মায়া (৪০)। তারা সবাই বহিষ্কৃত ছাত্র নাসিরুল্লাহর বাবার মাদ্রাসা অর্থাৎ মহিষকুন্ডি মুসলিমনগর দাখিল মাদ্রাসারই সহকারী শিক্ষক। তবে তারা ওই চুয়ামল্লিকপাড়া কেন্দ্রের অফিশিয়াল পরীক্ষা ডিউটিতে ছিলেন না বলে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

র‌্যাব ও পরীক্ষা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দাখিল স্তরের ‘জীববিজ্ঞান’ পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শিক্ষার্থী নাসিরুল্লাহর মূল পরীক্ষার খাতাটি কৌশলে কেন্দ্রের বাইরে নিয়ে আসা হয়। কেন্দ্রের বাইরে একটি গোপন স্থানে বসে ওই ৩ শিক্ষক মিলে ছাত্রের হয়ে উত্তরপত্র লিখে দিচ্ছিলেন। উত্তর লেখা শেষ করে পুনরায় খাতাটি পরীক্ষার হলে সংশ্লিষ্ট ছাত্রের বেঞ্চে জমা দেওয়ার ছক ছিল তাদের। জানা গেছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এবং মাদ্রাসার সুপারের প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে তারা এই পরীক্ষা কেন্দ্রে এই ধরণের সিন্ডিকেট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি করে আসছিলেন।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই র‍্যাবের একটি চৌকস দল চুয়ামল্লিকপাড়া রেজওয়ানুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আকস্মিক হানা দেয়। তারা শিক্ষকদের কক্ষের বাইরে হাতেনাতে খাতা লেখার সময় ওই ৩ শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে আটক করেন।

এদিকে শিক্ষকদের আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজনৈতিক জোর খাটিয়ে এবং তদবিরের মাধ্যমে আসামিদের ছিনিয়ে বা ছাড়িয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালান। একপর্যায়ে কিছু বহিরাগত ও উশৃঙ্খল লোক পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে চিল্লাচিল্লি ও বড় ধরণের হট্টগোল তৈরি করলে কেন্দ্রজুড়ে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মাঝেও এক ধরণের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ও আইনি ব্যবস্থা

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রদীপ কুমার দাস। তিনি বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বহিরাগতদের কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেন।

পরবর্তীতে ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত ও আলামত যাচাই শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রদীপ কুমার দাস দোষী পরীক্ষার্থী নাসিরুল্লাহকে বহিষ্কারের আদেশ দেন। একই সাথে আটককৃত ৩ জালিয়াত শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা মোতাবেক নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দৌলতপুর থানা পুলিশ ও র‌্যাবকে নির্দেশ দেন। এই ঘটনার পর উপজেলার অন্যান্য পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ