সিলেট মহানগরীর ব্যস্ততম ক্বীন ব্রিজ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় এক মাদকসেবীর বর্বরোচিত ও অতর্কিত হামলায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) এক সদস্য নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। নিহত ওই র্যাব সদস্যের নাম ইমন আচার্য্য। ঘটনার পর ঘাতক মাদকসেবী আত্মরক্ষার্থে পালাতে গিয়ে একটি বাড়িতে ঢুকে এক অবুজ শিশুকে গলায় ছুরি ধরে জিম্মি করে। পরবর্তীতে পুলিশ পুরো এলাকা ঘেরাও করে দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর চেষ্টার পর শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার এবং খুনিকে ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
আজ শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) দুপুরে নগরীর ঐতিহ্যবাহী ক্বীন ব্রিজ এবং তোপখানা এলাকায় এই হাড়হিম করা ঘটনাটি ঘটে। সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইনুল জাকির গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহত ইমন আচার্য্য র্যাব-৯ (সিলেট ক্যাম্প)-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদিকে আটককৃত ঘাতক ব্যক্তির নাম আসাদউল আলম বাপ্পী।
মাদকসেবীদের ধাওয়া ও র্যাব সদস্যের ওপর অতর্কিত হামলা
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুর ১২টার দিকে ক্বীন ব্রিজ এলাকায় প্রকাশ্য স্থানে বসে থাকা একদল মাদকসেবীকে ধাওয়া করে কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল। পুলিশের তাড়া খেয়ে মাদকসেবীরা চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় আসাদউল আলম বাপ্পী নামের এক কুখ্যাত মাদকসেবী ক্বীন ব্রিজের ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে দৌড়ে পালাচ্ছিল।
ঘটনাস্থলের ঠিক পাশেই সাদা পোশাকে (Civil Dress) গোয়েন্দা ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন র্যাব-৯ এর সদস্য ইমন আচার্য্য। বাপ্পীকে সন্দেহজনকভাবে দৌড়ে পালাতে দেখে ইমন সাহসিকতার সাথে তাকে জাপটে ধরে আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে বাপ্পী কোমর থেকে ধারালো ছুরি বের করে আকস্মিকভাবে র্যাব সদস্য ইমনের বুকে ও পেটে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়।
তোপখানায় হাড়হিম করা ‘শিশু জিম্মি’ নাটক
র্যাব সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে বাপ্পী দৌড়ে ক্বীন ব্রিজ সংলগ্ন তোপখানা এলাকার একটি আবাসিক বাসায় ঢুকে পড়ে। সেখানে উপস্থিত পরিবারের লোকজনের চিৎকারের মাঝেই সে চার বছর বয়সী একটি অবুজ শিশুর গলায় ধারালো ছুরি ধরে তাকে জিম্মি করে। বাপ্পী হুমকি দেয় যে, পুলিশ বা র্যাব যদি ঘরের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করে, তবে সে তাৎক্ষণিক শিশুটির গলা কেটে ফেলবে।
খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ও র্যাবের একাধিক টিম তোপখানার ওই বাড়িটি চারদিক থেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও ভারী অস্ত্রসহ কর্ডন (ঘেরাও) করে ফেলে। দীর্ঘ সময় পুলিশ অত্যন্ত কৌশলে মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে খুনি বাপ্পীর সাথে কথা বলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। অবশেষে একপর্যায়ে বাপ্পীর নজর এদিক-ওদিক হতেই পুলিশ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুটিকে সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় উদ্ধার করে। একই সাথে ঘাতক বাপ্পীকে রক্তমাখা ছুরিসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পর র্যাব সদস্যের মৃত্যু
এদিকে ক্বীন ব্রিজের ওপর রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকা র্যাব সদস্য ইমন আচার্য্যকে স্থানীয় লোক ও সহকর্মীরা দ্রুত উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেন এবং রক্তক্ষরণ বন্ধের আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তবে বুকের আঘাত অত্যন্ত গভীর হওয়ায় অবশেষে দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই বীর র্যাব সদস্য।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির বলেন, “আজ দুপুরে ক্বীন ব্রিজে মাদকসেবীদের ধাওয়ার সময় সাদা পোশাকে থাকা র্যাব সদস্য ইমনকে ছুরিকাঘাত করে খুনি বাপ্পী। এরপর সে তোপখানার একটি বাসায় ঢুকে শিশুকে জিম্মি করে। আমরা অত্যন্ত সফলভাবে ও বুদ্ধিমত্তার সাথে শিশুটিকে উদ্ধার করেছি এবং খুনি বাপ্পীকে আটক করেছি। গুরুতর আহত র্যাব সদস্য ওসমানী মেডিকেলে দুপুর দেড়টার দিকে মারা গেছেন। এই ঘটনায় সর্বোচ্চ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”

