রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে পাশবিক ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংস কায়দায় দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে হত্যার ঘটনায় রাজধানী ছাড়িয়ে এবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও তীব্র ক্ষোভ ও গণপ্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছে। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নরপশুদের দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার ও রামিসা হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলে রাজপথে নেমেছে বামপন্থী ছাত্র ও নারী সংগঠনগুলো।
আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) বিকাল ৫টায় সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট চট্টগ্রাম নগর শাখা এবং সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম চট্টগ্রাম জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে নগরীর ব্যস্ততম নিউমার্কেট মোড়ে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদী মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় নিউমার্কেট চত্বরে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশের নেতৃত্ব ও প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি মিরাজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রতিবাদ সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) চট্টগ্রাম জেলা শাখার ইনচার্জ আল কাদেরী জয়। সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন ছাত্র ফ্রন্টের স্কুল বিষয়ক সম্পাদক উম্মে হাবিবা শ্রাবণী।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন বাসদ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সদস্য আহমদ জসিম, হেলাল উদ্দিন কবির, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম চট্টগ্রাম জেলা শাখার সদস্য সুপ্রীতি বড়ুয়া এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট চট্টগ্রাম নগর শাখার সদস্য নোমান উদ্দিনসহ চট্টগ্রামের স্থানীয় ছাত্র ও যুব নেতৃবৃন্দ।
‘খুন করে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা সমাজকে হতবাক করেছে’
সমাবেশে বক্তারা বলেন, মিরপুরে ৮ বছরের অবুজ শিশু রামিসাকে যেভাবে নির্দয় ও পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাট করতে যেভাবে শিশুটির দেহকে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছে, তা পুরো দেশের মানুষকে স্তম্ভিত ও হতবাক করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে চলে আসা বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এই ধরনের পৈশাচিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটছে এবং অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।
বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এর আগে আমরা তনু, নুসরাত, আছিয়া ও ইরামনির মতো অসংখ্য নারী ও শিশু হত্যার কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার হতে দেখিনি। রাষ্ট্র যখন খুনি-ধর্ষকদের আড়াল করে, তখন বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা ধসে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে আজ রামিসার অসহায় বাবাকে গণমাধ্যমের সামনে বুক চাপড়ে বলতে শুনি—’আমি আর বিচার চাই না, আপনাদের বিচার করার কোনো ভালো উদাহরণ নেই’। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে?”
ধর্ষণের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও গণপ্রতিরোধের ডাক
সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের নেত্রীরা বলেন, বর্তমান সময়ে ঘরে কিংবা বাইরে—কোথাও নারী ও শিশুরা নিরাপদ নয়। প্রতিদিন দেশে অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতন-ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, যার মাত্র কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যম বা পত্রিকায় প্রকাশ পায়, আর বাকি বিশাল অংশই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা নারী, আর এই বিপুল নারী সমাজকে এভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের চাদরে বন্দি রেখে কোনোদিন একটি দেশ বা সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে রামিসা হত্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করে সমাজ থেকে এই বিকৃত মানসিকতা দূর করার তাগিদ দেন। একই সাথে চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে নারী-শিশু ধর্ষণ ও নিপিড়নের বিরুদ্ধে পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বক্তারা বলেন, নারীর প্রতি বিদ্যমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেবল একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব; যেখানে সত্যিকার অর্থে নারীর অধিকার, মর্যাদা এবং জীবনের শতভাগ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

