দেশের ঝিমিয়ে পড়া উৎপাদন খাতকে চাঙ্গা করতে এবং চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি বিশাল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং তীব্র সংকটে থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্দেশ্যে একযোগে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মেগা উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) বিকেলে ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেন গভর্নর ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন ও সুদের হার
ব্রিফিংয়ে গভর্নর ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এই বিশেষ প্যাকেজের আওতায় মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৪১ হাজার কোটি টাকা বন্ধ ও আংশিক সচল কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ‘পুনঃঅর্থায়ন’ (Refinancing) তহবিল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া অবশিষ্টাংশ ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব বিশেষ তহবিল থেকে সরাসরি সরবরাহ করবে।
ঋণ বিতরণের নীতিমালার বিষয়ে গভর্নর আরও জানান, গ্রাহক পর্যায়ে বড় ও বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে বার্ষিক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কুটির ও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে সুদের হার এই সীমার চেয়ে কিছুটা কম-বেশি বা পুনঃনির্ধারিত হতে পারে। এই তহবিল থেকে শুধু বড় শিল্পই নয়, বরং কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং দেশের চালিকাশক্তি কৃষি খাতেও সমানভাবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে।
১,২০০টিরও বেশি কারখানা চিহ্নিত: অগ্রাধিকার পাবে যারা
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের (ডলার সংকট) অস্থিরতার কারণে যেসব সম্ভাবনাময় শিল্প প্রতিষ্ঠান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলোই মূলত এই সুবিধার আওতায় আসবে।
ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশেষ অগ্রাধিকার নীতি অনুসরণ করা হবে। যেসব বন্ধ বা আংশিক সচল প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে এবং যাদের হাতে নিশ্চিত ক্রয়াদেশ (কনফার্মড পারচেজ অর্ডার) রয়েছে, তারা সবার আগে এই তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠন, চেম্বার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করে ১ হাজার ২০০টিরও বেশি বন্ধ ও আংশিক চালু শিল্প ইউনিটকে প্রাথমিকভাবে এই সুবিধার জন্য চিহ্নিত করেছে।
লক্ষ্য ২৫ লাখ কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজটি মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই টাকা ছাড় হওয়ার সাথে সাথে বন্ধ কারখানাগুলো উৎপাদনে ফিরবে, যার ফলে দেশে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা (Production Capacity) তৈরি হবে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং পরোক্ষভাবে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহও ত্বরান্বিত হবে। এর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সবুজ বিনিয়োগ (Green Investment) এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে আরও সম্প্রসারিত হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

