নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুরে গ্যাস লিকেজ থেকে ঘটা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ একই পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে মা সুলতানা আক্তার (৪২) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। আজ ১২ জুন (শুক্রবার) দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মৃত সুলতানা আক্তারের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশই আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়েছিল। শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অতিরিক্ত দগ্ধ হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
লিকেজ মেরামতের চেষ্টার পরই বিকট বিস্ফোরণ
এর আগে গত ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মদনপুর ছোটবাগ এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবনের ভাড়া বাসায় এই লোমহর্ষক দুর্ঘটনা ঘটে।
পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বাসার রান্নার গ্যাস লাইনে গত কয়েকদিন ধরেই মৃদু লিকেজ ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারের কর্তা ও পেশায় সবজি ব্যবসায়ী আলী আহমদ মান্নান কোনো টেকনিশিয়ান না ডেকে নিজেই পাইপের সেই লিকেজটি মেরামতের চেষ্টা করেন। মেরামত শেষে রান্নার জন্য দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে চুলা জ্বালানো মাত্রই ঘরের ভেতর আগে থেকে জমে থাকা গ্যাস থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তে পুরো ঘরে আগুন ধরে যায়।
এতে ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হন সবজি ব্যবসায়ী মান্নান, তাঁর স্ত্রী সুলতানা আক্তার, কলেজপড়ুয়া ছেলে সিয়াম, স্কুলপড়ুয়া মেয়ে মিমি এবং বাসার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারী শিশু হযরত আলী।
মদনপুর গ্যাস বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডির বর্তমান পরিস্থিতি:
| দগ্ধ ও ভুক্তভোগী সদস্য | বয়স ও পরিচয় | বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও আপডেট | দুর্ঘটনার প্রধান কারণ |
| সুলতানা আক্তার | ৪২ বছর (মা)। | চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত (৯০% দগ্ধ)। | গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণ। |
| আলী আহমদ মান্নান | সবজি ব্যবসায়ী (বাবা)। | আশঙ্কাজনক অবস্থায় বার্ন ইউনিটে ভর্তি। | নিজেই গ্যাস পাইপ মেরামত করার চেষ্টা করেছিলেন। |
| সিয়াম | কলেজ শিক্ষার্থী (ছেলে)। | অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, আইসিইউতে। | আগুনের তীব্র শিখায় শ্বাসনালী দগ্ধ। |
| মিমি ও হযরত আলী | মেয়ে ও পথচারী শিশু। | চিকিৎসাধীন, নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। | বিস্ফোরণের সময় ঘরের ভেতরে ও পাশে অবস্থান। |
আইসিইউতে কলেজপড়ুয়া সন্তান, কাটেনি শঙ্কা
মায়ের মৃত্যুর পরও এই পরিবারের বাকি তিন সদস্য ঢাকা বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউ ও এইচডিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সবজি ব্যবসায়ী মান্নান ও তাঁর ছেলে কলেজ শিক্ষার্থী সিয়ামের শরীরের একটা বড় অংশ পুড়ে গেছে। বিশেষ করে সিয়ামের শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর অবস্থা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। স্বজনদের আহাজারিতে এখন বার্ন ইনস্টিটিউটের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের কড়া সতর্কবার্তা: নিজেই মেরামত করতে যাবেন না
আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে গ্যাস লিকেজের ঘটনাকে অবহেলা করলে মুহূর্তেই তা কতটা প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে, মদনপুরের এই দুর্ঘটনা আবারও তার নির্মম উদাহরণ।
তিতাস গ্যাস ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলিন্ডার বা লাইনের গ্যাসে সুনির্দিষ্ট সুগন্ধী মেশানো থাকে যাতে লিকেজ হলে সহজে বোঝা যায়। ঘরে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে কোনো অবস্থাতেই দিয়াশলাই জ্বালানো, বৈদ্যুতিক লাইটের সুইচ অন বা অফ করা যাবে না। সবচেয়ে বড় ভুল হলো, সাধারণ মানুষ অনেক সময় অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান বা গ্যাস কোম্পানির লোক না ডেকে নিজেরাই টেপ বা প্লাস্টিক দিয়ে পাইপ মেরামতের চেষ্টা করেন। এতে লিকেজ পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে গ্যাস ঘরে জমে থাকে এবং সামান্য স্পার্ক পেলেই তা বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়। এই ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে অবিলম্বে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

