রংপুর মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসককে মারধর, জরুরি বিভাগ বন্ধ এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।
আজ শনিবার (১৩ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল ও সংলগ্ন মেডিকেল মোড় এলাকায় এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় প্রায় তিন ঘণ্টা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, আজ ভোরে রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূর নাহার বেগম হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর ছেলে রিফাত তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।
নিহতের স্বজনদের দাবি, জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পরে তাঁরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের রোগীকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীর ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। এর একপর্যায়ে রোগীর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মারা যান।
চিকিৎসক লাঞ্ছিত ও চিকিৎসাসেবা বন্ধ
রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ স্বজনেরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হন। এ সময় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাঈম ও রাকিবসহ কর্তব্যরত নার্সদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে স্বজনদের বিরুদ্ধে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে সকাল ১১টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। একই সঙ্গে নিহতের মরদেহ হাসপাতালের মর্গের সামনে আটকে রেখে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন তাঁরা। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন স্বজনেরা।
মহাসড়ক অবরোধ ও তীব্র যানজট
এদিকে মায়ের মরদেহ হস্তান্তরের দাবিতে নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দুপুর ১২টার দিকে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের ব্যস্ততম মেডিকেল মোড় এলাকায় অবস্থান নেন। তাঁরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এর ফলে ওই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সড়কের দুপাশে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সিসিটিভি ফুটেজ
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান। তিনি এইদিন এইসময়কে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে রোগীকে যখন হাসপাতালে আনা হয়েছিল, তার পরপরই তাঁর মৃত্যু হয়। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে দেখেছি, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের কোনো গাফিলতি ছিল না।’
পরিচালক আরও বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে অত্যন্ত অশোভন আচরণ এবং মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো চিকিৎসকই চান না যে কোনো রোগী অবহেলার কারণে মারা যাক। রোগীর স্বজনেরা যে আচরণ করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয় এবং নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। মরদেহ পাওয়ার পর দুপুরের পর মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন নিহতের স্বজনেরা। এরপর যানবাহন চলাচল শুরু হলে ধীরে ধীরে যানজট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। বর্তমানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ সব বিভাগের চিকিৎসাসেবা সচল রয়েছে এবং পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।

