ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক রায়ে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য (ভিসি) ড. হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জন আসামির সাজা নির্ধারণের আইনি যুক্তি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনার বিবরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। ট্রাইব্যunal-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রস্তুত করেছেন। এর আগে, গত ৯ এপ্রিল এই মামলার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।
সংক্ষিপ্ত রায় থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ: একনজরে সাজাপ্রাপ্তরা
আদালতের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায় অনুযায়ী, অভিযুক্ত ৩০ জন আসামির মধ্যে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫ জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৮ জনকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের একজন চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীর হাজতবাসের সময়কালকেই তাঁর সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করেছেন আদালত।
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাজার পূর্ণাঙ্গ তালিকা:
| সাজার ধরণ | সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের নাম ও পদবি | বর্তমান অবস্থা |
| মৃত্যুদণ্ড (২ জন) |
১. আমির হোসেন (সাবেক এএসআই, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ) ২. সুজন চন্দ্র রায় (সাবেক কনস্টেবল, আরএমপি) |
কারাগারে আটক / আইনি প্রক্রিয়ায় |
| যাবজ্জীবন (৩ জন) |
১. আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন (সাবেক এসি, কোতোয়ালি জোন) ২. রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন (সাবেক ওসি, তাজহাট থানা) ৩. বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব (সাবেক বেরোবি ক্যাম্প ইনচার্জ) |
সাজাপ্রাপ্ত ও কারাগারে |
| ১০ বছর কারাদণ্ড (৫ জন) |
১. ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু (সাবেক ভিসি, বেরোবি) ২. মো. মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু (সাবেক পুলিশ কমিশনার, আরএমপি) ৩. মশিউর রহমান (সাবেক সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ) ৪. আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ (সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ) ৫. পোমেল বড়ুয়া (সাবেক সভাপতি, বেরোবি ছাত্রলীগ)। |
সবাই পলাতক |
| ৫ বছর কারাদণ্ড (৮ জন) | শাহ নূর আলম পাটোয়ারী (সাবেক এডিসি), আবু মারুফ হোসেন (সাবেক ডিসি), শরিফুল ইসলাম (সাবেক প্রক্টর), রাফিউল হাসান রাসেল (সহকারী রেজিস্ট্রার), এমরান চৌধুরী আকাশ (ছাত্রলীগ), মাসুদুল হাসান (ছাত্রলীগ), মাহাবুবার রহমান বাবু (অফিস সহকারী) ও ডা. সারোয়ার হোসেন চন্দন (স্বাচিপ সভাপতি)। | সাজাপ্রাপ্ত |
| ৩ বছর কারাদণ্ড (১১ জন) | হাফিজুর রহমান তুফান, মনিরুজ্জামান পলাশ, মাহাফুজুর রহমান শামীম (ছাত্রলীগ সম্পাদক), ফজলে রাব্বী, আখতার হোসেন, সেজান আহম্মেদ, ধনঞ্জয় কুমার টগর, বাবুল হোসেন, নুরুন্নবী মণ্ডল, একেএম আমির হোসেন ও নূর আলম মিয়া। | সাজাপ্রাপ্ত |
পলাতক সাবেক ভিসি ও পুলিশ কমিশনারের ১০ বছরের সাজা
রায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আবু সাঈদ হত্যার ষড়যন্ত্র, উস্কানি এবং পুলিশকে নির্বিচারে গুলি করার নির্দেশ দেওয়ার অপরাধে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ এবং রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান বেল্টুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ের সময় এবং বর্তমানেও তারা আত্মগোপনে বা পলাতক রয়েছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলাম ও সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ও ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র ছাত্র আবু সাঈদের ওপর পুলিশের শটগানের গুলি ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই হত্যাকাণ্ড জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল। ৮০৯ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ রায়ে ভবিষ্যতে যেন কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নৃশংস বলপ্রয়োগ করতে না পারে, সেজন্য কঠোর আইনি বার্তা দেওয়া হয়েছে।

